মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি বাজারে। মে মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকার পর, জুন মাসের জন্য তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম আরও একদফা বাড়িয়েছে সরকার। আজ রবিবার (৩১ মে) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারিকৃত এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। নতুন নির্ধারিত এই মূল্য আজ রাত ১২টা (১ জুন) থেকে দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে বহুল ব্যবহৃত ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হলেও পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে প্রতি লিটার কেরোসিন ১৩০ টাকার পরিবর্তে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের ধারাবাহিক ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই দেশীয় বাজারে এই মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হলো।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত এপ্রিল মাসে মূল্যবৃদ্ধির পরই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছিল জ্বালানি তেল। এবার পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও একদফা বাড়ায় মধ্যবিত্তের যাতায়াত খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। এর আগে দেশের ইতিহাসে একলাফে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে। সে সময় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্সাপটে ডিজেলের দাম একধাক্কায় সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল, যদিও তীব্র সমালোচনার মুখে একই মাসে তা ৫ টাকা কমাতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে বিশ্ববাজারের দর, মুদ্রার বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে দেশে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি (অটোমেটেড প্রাইসিং মেকানিজম) চালু করে সরকার। এই নিয়ম অনুযায়ী, আগের মাসে আমদানিকৃত তেলের প্রকৃত খরচ বিবেচনা করে প্রতি মাসের শুরুতে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে সরবরাহ সংকটের আতঙ্ক তৈরি হলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির নজিরবিহীন দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।
সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকার চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যেও তেলের ওপর ভর্তুকি দিচ্ছিল। তবে বৈশ্বিক বাজারে দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে গত ১৮ এপ্রিল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাসের মাঝামাঝি সময়ে নির্বাহী আদেশে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়ানো হয়, যা ছিল স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালুর পর প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন সমন্বয়। ১৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া সেই দামে ডিজেল ১১5 টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে।
আইনি কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণের এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। অন্যদিকে, গণপরিবহন ও সাধারণ ভোক্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম সরকারের নির্বাহী আদেশে নির্ধারণ করে থাকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা নিম্নমুখী হওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ ও আমদানি ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে এই নতুন মূল্য সমন্বয়ের পথ বেছে নিতে হলো।













