দেশের ব্যাংকগুলোতে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) অভাবনীয় ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সংকটে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার বাজার। প্রবাসীদের পাঠানো ডলারের জোয়ারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এবং পতনমুখী রিজার্ভের ক্ষয় রুখতে বাজার থেকে প্রতিনিয়ত ও ধারাবাহিকভাবে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকগুলোতে ডলারের এই পর্যাপ্ত সরবরাহের সুযোগে গতকালও ছয়টি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নতুন করে ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডলার কেনার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত বুধবারেও বাজার থেকে চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ৭ কোটি ডলার কেনা হয়েছিল। এ নিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২০ মে পর্যন্ত মোট ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, রেমিট্যান্সে ভর করে ডলার কেনার এই অভিযান এতটাই জোরদার হয়েছে যে, শুধু চলতি মে মাসেই এখন পর্যন্ত বাজার থেকে মোট ৫৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে। সর্বশেষ প্রতি ডলারের কাট-অফ রেট বা কেনাকাটার দর নির্ধারণ করা হয়েছে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।
টানা ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের স্বস্তি ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ একধাক্কায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন (৩,৪৩৭ কোটি) ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ নির্দেশিত হিসাব পদ্ধতি ‘বিপিএম৬’ অনুসারে দেশের প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন (২,৯৭১ কোটি) ডলারে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি চরম ডলার সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ওই সময়ে জ্বালানি তেল, সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী আমদানির দায় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৫০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। এতে রিজার্ভে তীব্র টান পড়েছিল।
তবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের সেই ধারাবাহিক ডলার বিক্রির অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ক্ষীয়মাণ রিজার্ভের ভান্ডারকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন প্রতিনিয়ত বাজার থেকে ডলার ক্রয়ের এই বড় উদ্যোগ সচল রেখেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বাজার থেকে ডলার কেনার এই সুযোগ পাচ্ছে মূলত প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের কারণে। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পরিবার-পরিজনের কাছে অর্থ পাঠানো ব্যাপক হারে বাড়িয়েছেন, যার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি মে মাসের প্রথম ১৯ দিনেই দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৭৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার; অর্থাৎ বছর ব্যবধানে মে মাসের প্রথম ১৯ দিনেই প্রবাসী আয় প্রবাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন বা ৩৮ শতাংশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকারদের প্রত্যাশা, ঈদের আগে প্রবাসী আয়ের এই জোয়ার অব্যাহত থাকলে চলতি মাস শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনায়াসে ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে যাবে।
অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের প্রবাসী আয়ে এই ধারাবাহিক ও বড় প্রবৃদ্ধির ধারা শুরু হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ও রিজার্ভ পুনর্গঠনে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। হুন্ডি পরিহার করে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর মানসিকতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সংস্কারের ফলে রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের মোট পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ডলার, তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একধাক্কায় ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮৮ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। অর্থাৎ, বিগত অর্থবছরেই রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। রেমিট্যান্সের এই রেকর্ড ছোঁয়া উল্লম্ফন চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সম্পূর্ণ অব্যাহত রয়েছে এবং রিজার্ভকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী করে তুলছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে শুরু করে ১৯ মে পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট ৩ হাজার ১৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসের মোট আহরণকে (৩,০৩২ কোটি ৳৮৮ লাখ ডলার) এখনই ছাড়িয়ে গেছে। প্রবাসী আয়ের এই অভূতপূর্ব জোয়ারের কারণেই ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত ডলারের জোগান নিশ্চিত হচ্ছে, যার ওপর ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের রিজার্ভের ভান্ডারকে পুনর্কর্মক্ষম ও সমৃদ্ধ করতে পারছে।













