চট্টগ্রাম বন্দরের নির্মিতব্য বহুল আলোচিত ‘বে টার্মিনাল’ প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে নতুন করে ফের প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুর। এই মেগা প্রকল্পের একটি বড় অংশের আধুনিকায়নে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ করতে চায় দেশটি। সিঙ্গাপুরের অনাবাসিক হাইকমিশনার ডেরেক লো মনে করছেন, এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের বাণিজ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে তাঁর দপ্তরে সৌজন্য সাক্ষাতে এসে সিঙ্গাপুরের অনাবাসিক হাইকমিশনার ডেরেক লো এই আগ্রহের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। বৈঠকে বে টার্মিনাল ছাড়াও দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, কৃষিপণ্য রপ্তানি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপন নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনার ডেরেক লো বে টার্মিনাল প্রকল্পকে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বে টার্মিনাল পুরোদমে চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর ডেমারেজ বা বিলম্বজনিত কারণে যে বিপুল লোকসান হতো তা বন্ধ হবে এবং বাংলাদেশের সাধারণ রপ্তানিকারকদের জন্য উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক সাশ্রয় নিশ্চিত হবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াবে।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছনের অংশ থেকে রাণী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সোয়া ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশাল এলাকা জুড়ে সমুদ্রের কোল ঘেঁষে এই বে টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সেখানে অনায়াসে ১২ মিটার গভীরতা বা ড্রাফট এবং ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের বিশালাকার মাদার ভেসেল বা জাহাজ ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান জেটিগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে ১০ মিটারের বেশি গভীরতার কোনো জাহাজ দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে প্রবেশ করতে পারে না।
প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে গত এপ্রিল ২০২৬ মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বে টার্মিনাল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পুরো প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে একটি বড় অংশ অর্থাৎ ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক এবং বাকি ৪ হাজার ১৯২ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। মূলত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এখানে কয়েকটি আলাদা টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক খ্যাতনামা বহুজাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটি’ (পিএসএ) ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরেই এই বে টার্মিনালের প্রথম টার্মিনালটি নির্মাণ ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অপারেটরের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য লবিং করে আসছে। পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও এই অপারেটরের দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সায় ছিল। তবে একের পর এক দেশের সংবেদনশীল বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার কিছুটা পিছু হটেছিল।
এর আগে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, বে টার্মিনালের দুটি প্রধান টার্মিনালে পিএসএ এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের বিপুল সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসতে পারে।
মঙ্গলবারের বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিঙ্গাপুরের এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, উন্নত পরিকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি এবং রপ্তানিমুখী বিশেষ নীতির কারণে বাংলাদেশ এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বন্দর অবকাঠামো নয়, এর পাশাপাশি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং লজিস্টিকস খাতে দুই দেশের অংশীদারত্ব বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে।
হাইকমিশনার ডেরেক লো এই প্রসঙ্গে যোগ করেন, সিঙ্গাপুরের নিজস্ব খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে তারা বাংলাদেশ থেকে তাজা কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য আমদানিতে অত্যন্ত আগ্রহী। বর্তমানে সিঙ্গাপুর তাদের প্রয়োজনীয় তাজা পণ্যের সিংহভাগই অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান থেকে আমদানি করে থাকে; ফলে বাংলাদেশ যদি মানসম্মত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তবে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত দূর করা সম্ভব হবে।













