অস্থিতিশীল করনীতি ও ব্যাংক খাতের চরম তারল্য সংকটে বেসরকারি বিনিয়োগ তলানিতে নামায় চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৯ শতাংশে নেমে আসবে বলে আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যুব বেকারত্ব ৪০ শতাংশে পৌঁছানো ও কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির এই মহাসংকট থেকে উত্তরণে অলিগার্কবান্ধব শুল্ক কাঠামো পরিহার, ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং করনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
সোমবার (১৮ মে) পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে পিআরআই সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: স্পেশাল ফোকাস – আ বিজনেস এনভায়রনমেন্ট দ্যাট ডেলিভারস জবস’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ ও গোলটেবিল বৈঠকে নীতিনির্ধারকেরা এই হুঁশিয়ারি দেন।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড. ধ্রুব শর্মা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত শ্রমশক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট জানান, নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো, লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা জোরদার করা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে বিদ্যমান বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও মানসম্মত কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্যে পিআরআই-এর চেয়ারম্যান ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. জাইদী সাত্তার বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যেখানে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাস পরস্পর সম্পর্কযুক্ত; প্রবৃদ্ধি না হলে কর্মসংস্থান হবে না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য হ্রাসও সম্ভব নয়। তবে বাণিজ্য উদারীকরণ মডেলকে নতুনভাবে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি রেমিট্যান্সে সরকারের অতিরিক্ত ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ড. জাইদী সাত্তার দেশের কর প্রণোদনা কাঠামোর বৈষম্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তৈরি পোশাক খাত এখনও অন্যান্য উদীয়মান শিল্পখাতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম কর সুবিধা পাচ্ছে। তাছাড়া উচ্চ সুরক্ষামূলক শুল্কের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি থাকছে, যা তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করছে। ফ্রন্টিয়ার ফার্ম বা অগ্রগামী কোম্পানিগুলো দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ এবং রাজস্ব আয়ের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও তারা মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১৫ শতাংশ সৃষ্টি করছে, যা একটি বড় কাঠামোগত বৈষম্য।
প্যানেল আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশকে স্বল্পমূল্যের শ্রম ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষানীতি নির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে দ্রুত সরে আসতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক, স্বল্প মজুরিভিত্তিক এবং অনিশ্চিত। উদীয়মান শিল্পখাতের জন্য সরকারি নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হলেও, এসব সুবিধা যেন স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি না হয় সেজন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা ‘সানসেট ক্লজ’ থাকা জরুরি; একই সাথে তিনি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে বেসরকারি খাতের জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়নের প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই)-এর নির্বাহী পরিচালক টি. আই. এম. নুরুল কবির সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাসের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিনিয়োগকারীদের অনীহার প্রধান কারণ হচ্ছে অস্থিতিশীল রাজস্ব ও করনীতি। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা বা স্থায়িত্ব চান, কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আকস্মিক সম্পূরক শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ ব্যবসায়িক আস্থা নষ্ট করে। তিনি আগামী বাজেটে ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য কর নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
পিআরআই-এর মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, রাজস্ব ও আর্থিক খাত সংস্কারের প্রতি বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার এখন আর কোনো বিকল্প নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। এই ধরনের সংস্কার শুধু বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধারের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের যেকোনো বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়ক বলয় তৈরি করতে অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের তীব্র আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাতের মোট সম্পদের ৪৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ২২টি ব্যাংক তীব্র মূলধন সংকটে ভুগছে, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩০.৬ শতাংশে এবং সঞ্চিতি ঘাটতি ২৮.৫ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। এর পাশাপাশি সরকারের রেকর্ড পরিমাণ ব্যাংক ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
অর্থনৈতিক এই স্থবিরতার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান খাতের ওপর, যার ফলে শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২১.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গত এক দশকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় নারীদের কর্মসংস্থানসহ শ্রমশক্তির বড় অংশ কম উৎপাদনশীল কৃষি খাতের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে, যা তৈরি পোশাক খাতের পূর্বের অগ্রগতিকে বিপরীতমুখী করেছে। বর্তমানে দেশের বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান একটি ত্রুটিপূর্ণ পিরামিডের রূপ নিয়েছে, যেখানে ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের বিশাল বোঝা টেনে নিয়ে যাচ্ছে অনগ্রসর ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাত।
সেমিনারের সমাপনী বক্তব্যে পিআরআই-এর নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা মোকাবিলায় প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং অংশীজনদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপের ওপর জোর দেন। পরে একটি উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারী অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কার, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় করেন।













