অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি আর রাজনৈতিক প্রভাবের ভারে দেশের ২০টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ মূলধন ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে দেশের বহু ব্যাংক, আর খেলাপি ঋণের পাহাড় সেই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃতফসিল নীতিতে বিশেষ ছাড় ও নীতি সহায়তা দেওয়ার কারণে কাগজের কলমে আগের প্রান্তিকের তুলনায় শেষ তিন মাসে এই ঘাটতি কিছুটা কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ২৩টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ২০টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়। আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করা সব ব্যাংকের জন্যই বাধ্যতামূলক।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বছরের পর বছর আগ্রাসী ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় ঋণ অনুমোদনের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। ক্রমবর্ধমান মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির ইঙ্গিত। অতীতে সংকট কাটাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দেওয়া হয়েছিল সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকে, কিন্তু সুশাসনের অভাবে মূলধন সংকট কাটেনি।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতা মাপার অন্যতম প্রধান সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ডিসেম্বর শেষে নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম সিআরএআর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক। মূলত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছানোই মূলধন সাবার হওয়ার প্রধান কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। বিশেষায়িত খাতের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে। এই খাতের সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির অর্ধেকেরও বেশি। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ১২ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
এ ছাড়া বেসরকারি সাধারণ সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা, সিটিজেনস ব্যাংকের ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সেপ্টেম্বর প্রান্তিক থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে মূলধন ঘাটতি ৪ হাজার কোটি টাকা কমার প্রধান কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃতফসিল নীতি। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। যেহেতু ব্যাংকের মূলধন থেকেই প্রভিশন রাখা হয়, তাই প্রভিশনের চাপ কমায় মূলধন ঘাটতিও কাগজে-কলমে কিছুটা কমে এসেছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, শুধু পুনঃতফসিল করে মূলধন ঘাটতি সাময়িকভাবে কমানো গেলেও ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল পরিচালনা ব্যবস্থা এবং খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলেই এ সংকট গভীর হয়েছে। কাগজে-কলমে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো দেখানো গেলেও এতে প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য উন্নত হয় না; খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা ও ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত না হলে মূলধন ঘাটতি আগামীতে আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।













