দেশের ব্যাংক খাত থেকে যারা জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে টাকা লুট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। একই সাথে লুটেরা মালিক ও চক্রের শেয়ারসহ অভ্যন্তরীণ সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি বিতর্কিত প্রাক্তন উদ্যোক্তা ও বড় খেলাপিদের কোনোভাবেই যাতে ব্যাংকিং সিস্টেমে ফিরে আসতে না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
আসন্ন জাতীয় বাজেট এবং ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষার লক্ষ্যে মঙ্গলবার (১৯ মে) বিএবি-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সচিবালয়ে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়ে এই দাবি জানান। বৈঠকে ব্যাংক খাতের মূলধন সংকট কাটাতে কর্পোরেট কর কমানোসহ ১০ দফা বাজেটীয় ও কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ জমা দেওয়া হয়। সভায় বিএবির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকারসহ শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বিএবি-এর পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয়, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততার তীব্র চাপ, বেসরকারি খাতে ঋণের ধীরগতি এবং সুশাসনের অভাবে ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতার কারণে মন্দ ঋণ আদায় থমকে থাকায় পুরো ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির গড় মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে। এই নাজুক পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিচ্ছে, যা শিল্প প্রবৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের অর্থায়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সাথে প্রস্তাবিত ‘ব্যাংকিং রেজোলিউশন ফ্রেমওয়ার্ক’-এর ‘ধারা ১৮কে’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যাংক মালিকদের এই সংগঠন। বিএবি স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ধারার আড়ালে যদি কোনো বিতর্কিত প্রাক্তন স্পন্সর পরিচালক কিংবা বড় ঋণখেলাপিদের আবারও কোনো কায়দায় ব্যাংকের মালিকানায় বা পরিচালনা পর্ষদে ফিরে আসার সামান্যতম সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা আমানতকারীদের আস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে। এটি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে নেতিবাচক করার পাশাপাশি চলমান ব্যাংকিং সংস্কারের পুরো নির্ভরযোগ্যতাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেবে।
ব্যাংক খাতের প্রকৃত পুনর্গঠনের জন্য শুধুমাত্র কাগজের নীতি সহায়তা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে বিএবি শক্তিশালী রিকভারি মেকানিজম চালুর দাবি তুলেছে। সংগঠনটির মতে, যারা ব্যাংক ব্যবস্থার টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে বা অন্য খাতে সরিয়ে নিয়েছে, তাদের শেয়ার ও সম্পদ অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত বা ক্রোক করতে হবে। এছাড়া দ্রুততম সময়ে খেলাপি ঋণ আদায় ও নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত ‘ফাস্ট-ট্র্যাক ফাইন্যান্সিয়াল কোর্ট’ বা দ্রুত বিচার আদালত গঠন এবং ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী ও মন্দ সম্পদ দ্রুত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ (এএমসি) প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় সুশাসন সংক্রান্ত বিধিমালাগুলোর যৌক্তিকীকরণের তাগিদ দিয়েছে বিএবি। বিশেষ করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের আধিপত্য খর্ব করতে ‘পরিবার’-এর আইনি সংজ্ঞা পুনঃনির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। বিএবি-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংক পরিচালনায় পরিবারের সংজ্ঞা কেবল স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরর্শীল সন্তান এবং সম্পূর্ণভাবে আর্থিক ও অন্যান্য বিষয়ে নির্ভরশীল পারিবারিক সদস্যদের মধ্যেই কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
আসন্ন বাজেটে ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ মূলধন গঠন ও ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অর্জনে অর্থমন্ত্রীর কাছে পেশ করা বিএবির ১০ সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—ব্যাংক খাতের কর্পোরেট কর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে নামানো, খেলাপি ঋণের বিপরীতে রাখা লোন-লস প্রভিশনের পুরো অর্থকে আগামী ৫ বছরের জন্য শতভাগ কর রেয়াত দেওয়া এবং মূলধন ধরে রাখাকে উৎসাহিত করতে স্টক লভ্যাংশের ওপর থেকে সব অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার করা। এছাড়া মূলধন ঘাটতি মেটাতে রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে অনুমোদন দেওয়া এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প পুনর্ব্যবহারযোগ্য তহবিল, সবুজ অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি এলটিটিএফ সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
ব্যাংক থেকে টাকা উদ্ধার ও মূলধন সংগ্রহ সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় নিশ্চিত করা, মন্দ সম্পদ আদায়ের গতি বাড়াতে দ্রুত বিচার আর্থিক আদালত ও কেন্দ্রীয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি স্থাপন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কার করে পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সংজ্ঞা কেবল স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীল সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
একই সাথে দেশের আর্থিক খাতকে আধুনিক করতে ডিজিটাল ইন্টারঅপারেবিলিটি সম্প্রসারণ ও ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এজেন্ডাকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে অংশীজনদের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংগঠনটি।
উচ্চপর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিএবি-এর চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ব্যাংক এশিয়া পিএলসির চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী, ইউসিবি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান শরিফ জহির, পূবালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান রাশেদ আহমেদ চৌধুরীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিরা।













