বিগত সরকারের আমলে নেওয়া অধিকাংশ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণের পরদিন থেকেই ‘মৃত দলিলে’ পরিণত হতো বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, পরিকল্পনা প্রণয়নের সেই পুরনো ও অকার্যকর ধারা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বাস্তবভিত্তিক নতুন কাঠামো তৈরি করছে বর্তমান সরকার। উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, অতীতে পরিকল্পনা কমিশন অনেক ক্ষেত্রে কেবল ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ করলেও এখন একে একটি শক্তিশালী নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন সংক্রান্ত কমিটির দ্বিতীয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিতুমীর অভিযোগ করেন, আগে স্বজনতোষী পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন করা হতো। এর সঙ্গে ছিল অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন পরিকল্পনা, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে গভীর চাপে ফেলেছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে জনস্বার্থে নতুন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
পূর্ববর্তী পদ্ধতির কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বারবার সংশোধন, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া এবং ‘জুন সিনড্রোম’-এর মতো প্রবণতা পুরো পরিকল্পনা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এই অচলাবস্থা ভাঙতে নতুন কাঠামোতে চারটি বড় সংস্কারের কথা জানান তিনি। প্রথমত, প্রকল্প নির্বাচন বা ‘প্রোগ্রামিং’ প্রক্রিয়াকে জনরায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে।
তৃতীয় বড় সংস্কার হিসেবে তিতুমীর তথ্যের অবাধ প্রবাহের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন থেকে প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য উন্মুক্ত থাকবে যাতে গবেষক, শিক্ষক ও সাধারণ নাগরিকরা প্রকল্পের বাস্তব চিত্র যাচাই করতে পারেন। চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়াকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। উপদেষ্টা মনে করেন, জনগণের করের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তথ্য উন্মুক্ত থাকলে নাগরিকরা সরকারের দাবি ও প্রকল্পের বাস্তব অর্জনের পার্থক্য বুঝতে পারবেন, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
নতুন এই অর্থনৈতিক কৌশলের একটি বড় লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’তে রূপান্তর করা। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, আধুনিক কৌশল এবং পরিমাপযোগ্য সূচক (ইন্ডিকেটর) নির্ধারণ করা হচ্ছে। নতুন কাঠামোতে সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই প্রতিটি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, যাতে কোনো প্রকল্পই অহেতুক বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।
তিতুমীর দাবি করেন, এই নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অংশগ্রহণমূলক। অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের মতামতের ভিত্তিতে এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা, বার্ষিক পরিকল্পনা এবং পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনাগুলোকে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, জনগণের ভোট ও নির্বাচনী ইশতেহার থেকে প্রাপ্ত অগ্রাধিকারগুলোকেই এখন সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক এজেন্ডায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন করা। যেখানে প্রতিটি প্রকল্পের সার্থকতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে।








