বাংলাদেশের তামাক বাজারে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রি নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। পণ্য বিক্রি ও আয়—উভয়ই জ্যামিতিক হারে কমতে থাকায় শীর্ষ এই তামাক কোম্পানির নিট মুনাফায় বড় ধরনের ধস নেমেছে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই তিন মাসে বিএটি বাংলাদেশ মোট ৯২৩ কোটি স্টিক সিগারেট বিক্রি করেছে। অথচ তিন বছর আগে অর্থাৎ ২০২৩ সালের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ১,৭৯৯ কোটি স্টিক। সেই হিসাবে মাত্র তিন বছরে কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রির ভলিউম কমেছে ৪৮.৭২ শতাংশ। ২০২৪ সাল থেকেই বিক্রির এই নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হলেও বর্তমান সময়ে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
ব্যবসায়িক এই মন্দার প্রভাব সরাসরি পড়েছে কোম্পানির মুনাফায়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিএটির নিট মুনাফা হয়েছে ২০৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম। কোম্পানিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তামাকপণ্যে অস্বাভাবিক হারে শুল্ক বৃদ্ধি এবং বাজারে অবৈধ সিগারেটের দাপট বেড়ে যাওয়াই এই সংকটের প্রধান কারণ।
কোম্পানিটির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিএটি বাংলাদেশের মোট সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭,১০২ কোটি স্টিক। যা পরের বছর ২০২৪ সালে ৩১৮ কোটি স্টিক কমে দাঁড়ায় ৬,৭৮৪ কোটি স্টিকে। ২০২৫ সালে এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয় এবং এক বছরেই ১,৭৯৬ কোটি স্টিক বিক্রি কমে মোট ভলিউম ৪,৯৮৮ কোটি স্টিকে নেমে আসে। সিগারেটের এই ধারাবাহিক পতনের চিত্র ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেও অব্যাহত রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে সিগারেট বিক্রি কমেছে ১৫০.৭০ কোটি স্টিক বা ১৪ শতাংশ। বিক্রির এই ধস শুধু কোম্পানির মুনাফাতেই আঘাত করেনি, সরকারের রাজস্ব আয়ও কমিয়ে দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সিগারেট বিক্রি থেকে কোম্পানির রেভিনিউ ছিল ৪,৭২৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ কম। এর ফলে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ সরকারের আয় কমেছে ৪৪০ কোটি টাকা। এছাড়া আয়কর বাবদ সরকার পেয়েছে ২৮৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৫৬ কোটি টাকা কম।
রিপোর্টে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিএটির নিট আয় হয়েছে ১,৪৩২ কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে ২৩ শতাংশ কম। আশ্চর্যজনকভাবে এ সময় উৎপাদন খরচ নিট বিক্রির ৫১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৪ শতাংশে নামিয়ে আনলেও মোট মুনাফায় কোনো উন্নতি হয়নি; বরং তা ১২ শতাংশ কমে গেছে। এর ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয়, যা ১৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিএটি বাংলাদেশের চলমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে তামাকপণ্যের ওপর অস্বাভাবিক শুল্ক আরোপে। সাত মাসের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সিগারেটের গড় দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় গত তিন বছরে কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রির পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও কাঁচামাল আমদানির ব্যয় কয়েক গুণ বাড়ায় উৎপাদন খরচ ও মুনাফার ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়িক এই মন্দার পাশাপাশি দীর্ঘ ৬০ বছর পর মহাখালী থেকে কারখানা ও অফিস সাভারে স্থানান্তরের বিশাল এককালীন খরচ কোম্পানিকে বহন করতে হয়েছে, যা মুনাফায় বড় ধস নামিয়েছে।
অন্যদিকে, বৈধ সিগারেটের দাম বাড়ায় বাজারে কর ফাঁকি দেওয়া অবৈধ সিগারেটের দাপট গত এক বছরে প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এর সঙ্গে তামাক চাষে কৃষি জমির ব্যবহার সীমিত করার সরকারি উদ্যোগ এবং কঠোর তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী প্রস্তাব আগামীতে কোম্পানির কাঁচামাল সরবরাহ ও বাজার হিস্যা রক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।








