দেশের শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতে গতিশীলতা বজায় রাখতে ঋণ বিতরণের বিদ্যমান নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা বিবেচনায় নিয়ে বড় শিল্প গ্রুপগুলোর জন্য ঋণের সীমা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়া যাবে, যা আগে ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে বুধবার (১৩ মে) জারি করা এক সার্কুলারে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বড় ব্যবসায়ীরা এই বর্ধিত ঋণসীমা উপভোগ করতে পারবেন। মূলত দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলোর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম যেন অর্থের অভাবে স্থবির না হয়ে পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই ছাড় দিয়েছে।
একক গ্রাহক ঋণসীমা বা ‘সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট’ ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার ফলে ব্যবসায়িক খাতে বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। আগে বড় কোনো গ্রুপকে তাদের মোট ঋণের জন্য ব্যাংকের মূলধনের একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে থাকতে হতো। এখন এই সীমা বাড়ায় বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, ভারী শিল্পকারখানা এবং মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের জোগান দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য অনেক সহজ হবে।
বিশেষ করে যারা কাঁচামাল বা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য বড় অংকের এলসি (ঋণপত্র) খোলেন, তারা এখন একক ব্যাংক থেকেই বেশি পরিমাণ সুবিধা পাবেন। আগে অনেক সময় দেখা যেত গ্রাহকের প্রয়োজন বেশি থাকলেও ঋণসীমা অতিক্রম করায় ব্যাংকগুলো কাঙ্ক্ষিত অর্থায়ন করতে পারত না। এখন সেই বাধা কেটে যাওয়ায় শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
নন-ফান্ডেড ঋণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কারিগরি পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এলসি বা ব্যাংক গ্যারান্টির মতো অফ-ব্যালেন্স শিট সুবিধার ক্ষেত্রে রূপান্তর হার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণে গ্যারান্টি বা এলসি সুবিধা প্রদানের সুযোগ পাবে। এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নকে আরও গতিশীল করবে।
তবে এই বিশেষ সুবিধা ব্যবসায়ীদের জন্য চিরস্থায়ী নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৭ সালের পর থেকে এই রূপান্তর হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। ২০২৭ শেষে এটি ৩০ শতাংশ, ২০২৮ শেষে ৪০ শতাংশ এবং ২০২৯ শেষে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। ২০৩০ সালের শুরু থেকে আগের কঠোর বিধান পুনরায় কার্যকর হবে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই বিশেষ ছাড় দিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ঋণসীমা বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের ছাড় দিলেও ব্যাংকগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে কোনো ব্যাংকের বৃহৎ ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নির্ভর করবে তাদের খেলাপি ঋণের (NPL) হারের ওপর। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি, তাদের বড় অংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা তত কমবে। এটি মূলত ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে আরও তৎপর হতে বাধ্য করার একটি কৌশল।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে থাকলে তারা মোট ঋণ ও অগ্রিমের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃহৎ ঋণ দিতে পারবে। কিন্তু খেলাপি ঋণ যদি ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তবে সেই সীমা সরাসরি কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। সব মিলিয়ে কোনো ব্যাংকই তার মোট মূলধনের ৬০০ শতাংশের বেশি বৃহৎ ঋণ এক্সপোজার রাখতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর সংশ্লিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে এই সময়োপযোগী নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারবে, যা প্রকারান্তরে দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।








