বছরের পর বছর ধরে চলা নজিরবিহীন ঋণ জালিয়াতি, লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণে পঙ্গু হয়ে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের চূড়ান্ত প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। মঙ্গলবার (১২ মে) গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুট হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে আগামী বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে। এই তহবিলের নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবসায়নের মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
অবসায়ন তালিকায় থাকা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো— ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফাইন্যান্স এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। এর মধ্যে আভিভা ছাড়া অন্য চার প্রতিষ্ঠানই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। গত মঙ্গলবারও এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। তবে অবসায়ন হতে যাওয়া এসব এনবিএফআই-এর শেয়ারহোল্ডাররা কোনো অর্থ ফেরত পাবেন কি না—সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে এস আলমের লুটপাটের শিকার ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংক একীভূত হলেও এর সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কিছুই পাননি। এবারও এমন আশঙ্কা রয়েছে।
লুট হওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পতনের নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত সুপরিকল্পিত অর্থ আত্মসাৎ। বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং এবং এফএএস ফাইন্যান্সের নজিরবিহীন লুণ্ঠনের প্রধান কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের নাম। পিকে হালদার ও তাঁর সহযোগীরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কৌশলে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যিনি বর্তমানে ভারতের কারাগারে রয়েছেন।
লুটপাটের খতিয়ান ও কেলেঙ্কারির নেপথ্য কারিগর
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়, যার বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৯.৪৪ শতাংশ। পিপলস লিজিং ছিল দেশের আর্থিক খাতের প্রথম বড় পতনের উদাহরণ। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটি পিকে হালদারের গ্রাসে পড়ে ২০১৬ সাল নাগাদ দেউলিয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং বর্তমানে এর ৮০০ কোটি টাকার বেশি আমানত আটকে আছে। পিপলস লিজিংয়ের খেলাপি ঋণের হার এখন ৯৫ শতাংশ।
এফএএস ফাইন্যান্সের অবস্থাও একই; পিকে হালদার সিন্ডিকেট অস্তিত্বহীন কাগুজে কোম্পানির নামে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে এর সব ঋণই খেলাপি। তালিকায় থাকা আভিভা ফাইন্যান্স (সাবেক রিলায়েন্স ফাইন্যান্স) এক সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান থাকলেও এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন থাকাকালীন এটি ব্যাপক ঋণ অনিয়মের শিকার হয়। নিয়মবহির্ভূতভাবে শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ফলে বর্তমানে এর খেলাপি ঋণের হার ৯৩.৯৩ শতাংশে ঠেকেছে।
ফারইস্ট ফাইন্যান্সের পতনের নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের বেনামি ঋণ গ্রহণ। বর্তমানে এর খেলাপি ঋণের হার ৯৮.৫০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত লোকসান ও আদায় অযোগ্য ঋণের ভার এতটাই বেড়েছে যে, আমানতকারীদের সুদ বা আসল পরিশোধের ন্যূনতম সক্ষমতা তারা হারিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ
দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় অবসায়নকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক রেজুলেশন আইনের আওতায় আগামী জুলাই থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের বন্ধ বা অবসায়ন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। এই আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রশাসকের সাথে আরও দুজন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে যারা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া তদারকি করবেন।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের মে মাসে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কেন ২০টি এনবিএফআই বন্ধ করা হবে না—এই মর্মে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা ছিল হতাশাজনক। পরবর্তীতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তালিকা পুনর্গঠন করে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি-কে বাদ দিয়ে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সর্বশেষ সভায় প্রিমিয়ার লিজিং-কেও তালিকা থেকে বাদ দিয়ে চূড়ান্তভাবে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ মনে করছে, এসব রুগ্ণ প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা মানে আমানতকারীদের অর্থের আরও ক্ষতি করা। ব্যাংক রেজুলেশন আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আর্থিক খাতে যারা অনিয়ম ও লুটপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি প্রতিফলিত হয়েছে।
আমানত ফেরত ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
অবসায়ন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আমানতকারীদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, তালিকায় থাকা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। এ জন্য প্রয়োজনীয় ৫ হাজার কোটি টাকা আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে রাখা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে উদ্বেগ ছিল, তা কিছুটা লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লিকুইডেটর নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে ক্রমান্বয়ে পাওনা পরিশোধ করা হবে। তবে যে পরিমাণ অর্থ পাচার ও জালিয়াতি হয়েছে, তাতে আমানতকারীরা তাদের জমার পুরো অংশ ফেরত পাবেন কি না তা নির্ভর করবে সম্পদ উদ্ধারের ওপর। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় হওয়া এসব অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির দায় যাতে সাধারণ মানুষকে বইতে না হয়, সেজন্যই সরকারের এই বিশেষ অর্থায়ন উদ্যোগ।
সামগ্রিকভাবে, এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত দেশের ভঙ্গুর আর্থিক খাতের আমূল সংস্কারের প্রথম ধাপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর্থিক শৃঙ্খলার এই নতুন যুগে অনিয়মকারী ও ঋণখেলাপিদের আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না—এই বার্তাই এখন সুস্পষ্ট।পতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী। বৈঠকে দেশের শিল্পখাত এবং অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা ও আন্তরিক সদিচ্ছার জন্য বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।











