একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করছে বর্তমান সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ‘বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা’ খাতের জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সিংহভাগই ব্যয় করা হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে।
পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত এডিপি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে থাকা বিশেষ থোক বরাদ্দ থেকে শুধুমাত্র ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পরিবার কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি খাদ্য ও নিত্যপণ্য সহায়তা পৌঁছে দিতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি মেগা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি বিশেষ এই থোক বরাদ্দের ৮৫ শতাংশের বেশি। এ খাতের অবশিষ্ট আড়াই হাজার কোটি টাকার মধ্যে কৃষক কার্ডের জন্য ১৪০০ কোটি টাকা এবং মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তির সম্মানী বাবদ ১১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এই বরাদ্দ মূলত সেই রাজনৈতিক দর্শনেরই প্রতিফলন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর স্পষ্ট করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকা লিকুইডেশন ও অন্তর্ভুক্তি ত্রুটি দূর করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে।
ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ১ কোটি ২০ লাখ নিম্নআয়ের পরিবার টিসিবির মাধ্যমে প্রতি মাসে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য কেনার স্থায়ী সুবিধা পাবে। এছাড়া ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ নীতির ভিত্তিতে এই কার্ডের সাথে ডিজিটাল ওয়ালেট যুক্ত থাকবে, যার মাধ্যমে সরাসরি সরকারের মাসিক নগদ সহায়তা ও বিভিন্ন সামাজিক ভাতা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই স্বচ্ছতার সাথে গ্রহীতার হাতে পৌঁছে যাবে।
ভবিষ্যতে এই কার্ডটিকে একটি বহুমুখী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা হবে, যা শিক্ষা উপবৃত্তি, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন ত্রাণ সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কার্ডটি একটি শক্তিশালী ডেটাবেজ হিসেবে কাজ করবে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের ‘মানবিক রাষ্ট্র’ গড়ার প্রতিশ্রুতি পূরণে সহায়ক হবে।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে—জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোকে এই কার্ডের আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
ড. তিতুমীর সম্প্রতি এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় জানিয়েছিলেন যে, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই ফ্যামিলি কার্ড ডিজাইন করা হয়েছে। ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) ব্যবহার করে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড রাখা হবে, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা অনিয়মের সুযোগ না থাকে। এমনকি করদাতাদের দেওয়া রসিদেও উল্লেখ থাকবে যে, তাদের করের অর্থের কত শতাংশ এই কার্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে।
আগামী অর্থবছরের ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে স্থানীয় মুদ্রার জোগান ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে বড় একটি অংশই কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের অধীনে নেই। সাধারণত প্রতি অর্থবছরে থোক বরাদ্দ ১৫ হাজার কোটি টাকার আশেপাশে থাকলেও এবার তা ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর বাইরে বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলের ‘উপবৃত্তি’ ও ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ কর্মসূচির আধুনিক ও ডিজিটাল সংস্করণ হচ্ছে বর্তমানের এই ফ্যামিলি কার্ড। অতীতে যেখানে ত্রাণ বা সহায়তা প্রদান ছিল আমলাতান্ত্রিক বা দলীয় প্রভাবাধীন, সেখানে বর্তমান সরকার একে একটি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন মূলত অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ এবং দাতা সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সহায়তা থেকে সংস্থান করা হয়েছে। সরকার বিশ্বাস করে, প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। এনইসি সভায় অনুমোদনের পর আগামী জুলাই মাস থেকেই এই বর্ধিত বরাদ্দের মাধ্যমে নতুন কার্ড বিতরণ ও সেবা কার্যক্রম দেশব্যাপী শুরু হবে।











