২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ভঙ্গুর ও অসম পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক খাতের চাপ অর্থনীতিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে । ২০২৪ সালের শেষভাগের রাজনৈতিক রূপান্তর-পরবর্তী অস্থিরতা কিছুটা প্রশমিত হলেও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল শিল্প কর্মকাণ্ড এবং বেসরকারি খাতের সাবধানী অবস্থানের কারণে অর্থনৈতিক গতিশীলতা এখনো সংকুচিত হয়ে আছে ।
মঙ্গলবার প্রকাশিত মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এর ‘রিভিউ অব ইকোনমিক সিচুয়েশন ইন বাংলাদেশ (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনায় এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স ছিল মূলত মিশ্র । রফতানি খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে প্রবৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত সীমিত । অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের কঠোর শর্তাবলি । এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে ।
খাতওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি খাতে ২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩.৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা প্রথম প্রান্তিকের ২.১১ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি । অনুকূল আবহাওয়া এবং সরকারের সার ও ঋণ সহায়তার ফলে এই সাফল্য এসেছে । তবে শিল্প খাতে বড় ধরনের ধস লক্ষ্য করা গেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.২৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৬.৮২ শতাংশ । বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং সাব-সেক্টরের প্রবৃদ্ধি ৬.০৯ শতাংশ থেকে কমে ১.১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে ।
রফতানি খাতেও চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। মার্চ ২০২৬-এ পণ্য রফতানি ১৭.৮২ শতাংশ কমে ৩.৪৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে । সামগ্রিকভাবে জুলাই-মার্চ মেয়াদে রফতানি আয় ৩.৭৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে । এর প্রধান কারণ তৈরি পোশাক রফতানি ৪.৫০ শতাংশ হ্রাস পাওয়া । অন্যদিকে, জুলাই-ফেব্রুয়ারি মেয়াদে আমদানি ৪.৮৮ শতাংশ বেড়ে ৪৮.৭৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে । রফতানি হ্রাস ও আমদানি বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ১৬.৯১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে ।
এমসিসিআই তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা ছিল রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় । ২০২৬ সালের মার্চ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড । জুলাই-মার্চ মেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২০.৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৬.২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে । এই শক্তিশালী প্রবাহের ফলেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে । মার্চ ২০২৬ শেষে বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯.৫০ বিলিয়ন ডলার।
তবে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। জুলাই-মার্চ মেয়াদে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯৭,৯৯০ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ রাজস্ব ঘাটতি । এদিকে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়ালেও এটি সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি । খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও জ্বালানি ও পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে ।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পথে থাকলেও তা এখনো অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বহুমুখী ঝুঁকির মুখে রয়েছে । প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতি রোধ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি । সামনের প্রান্তিকে রফতানি ও আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ধর্মীয় উৎসবের কারণে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে ।











