উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটের বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিকূলতায় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বহুজাতিক সিমেন্ট উৎপাদক প্রতিষ্ঠান লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কোম্পানিটির নিট বিক্রয় ও মুনাফা—উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট মুনাফা ১৯ শতাংশ কমে ১১২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ১৩৯ কোটি টাকা।
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লাফার্জহোলসিমের নিট বিক্রয় আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ কমে ৮০৪ কোটি টাকা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৮৫১ কোটি টাকা। তবে বিক্রি কমলেও উৎপাদন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির উৎপাদন ব্যয় ছিল মোট টার্নওভারের ৭০.৭ শতাংশ, যা চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৭৬.৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বিক্রি কম ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বহুজাতিক এই কোম্পানিটির মুনাফা কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়েও (ইপিএস)। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির ইপিএস ১৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ০.৯৭ টাকায়, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ১.২০ টাকা। মূলত জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কোম্পানির আয়ে এই বড় ধস নামিয়েছে।
প্রথম প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমের পরিচালন মুনাফাও বড় ধাক্কা খেয়েছে। গত বছরের ১৭৮ কোটি টাকার তুলনায় এ বছর পরিচালন মুনাফা ৩১ শতাংশ কমে ১২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক এই নেতিবাচক পরিস্থিতি কোম্পানির প্রফিট মার্জিনের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করলেও কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সুদ আয় ও পরিচালন দক্ষতার মাধ্যমে বড় বিপর্যয় এড়ানোর চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল চৌধুরী জানিয়েছেন, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ জ্বালানি খরচের প্রভাবে সৃষ্ট কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তারা উদ্ভাবন ও পরিচালনগত উৎকর্ষের মাধ্যমে টেকসই অবস্থান ধরে রাখতে কাজ করছেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবিলায় তারা সক্রিয়ভাবে কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি এবং কৌশলগত মূল্য নির্ধারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছেন।
ব্যবসায়িক মন্দা কাটাতে এবং আয় বাড়াতে চলতি বছরের শুরুতেই ‘হোলসিম কোস্টাল গার্ড’ এবং ‘পাওয়ারক্রিট’ নামে দুটি বিশেষায়িত পণ্য বাজারে এনেছে লাফার্জহোলসিম। উপকূলীয় অঞ্চল এবং রেডিমিক্স শিল্পের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত এই পণ্যগুলো সামনের প্রান্তিকগুলোতে কোম্পানির আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছে। এর পাশাপাশি ‘হোলসিম ওয়াটার প্রোটেক্ট’ ও ‘সুপারক্রিট প্লাস’ বাজারে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
পরিবেশ রক্ষা ও ব্যয় কমাতে লাফার্জহোলসিমের ‘জিওসাইকেল’ প্রকল্প থেকে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে জিওসাইকেলের মাধ্যমে প্রায় ১২ হাজার টন বর্জ্য টেকসই উপায়ে কো-প্রসেসিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১৩ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা ও গ্যাস) ব্যবহার হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে, যা কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা প্রসঙ্গে লাফার্জহোলসিম জানিয়েছে, চলমান মুদ্রাস্ফীতি এবং উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে সামনের দিনগুলোও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তবে সেরা মুনাফার মার্জিন ধরে রেখে এবং ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে সামনের প্রান্তিকগুলোতে আরও ভালো ব্যবসায়িক ফলাফল উপহার দিতে তারা আশাবাদী। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে তাদের পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনা করছে।











