দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে ব্যাংক ঋণের তথ্যভাণ্ডার বা সিআইবি রিপোর্টে ‘গ্রুপ কনসেপ্ট’ বাতিল এবং দণ্ড সুদ (পেনাল ইন্টারেস্ট) বন্ধের দাবি জানিয়েছেন শীর্ষ উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, একই পরিচালক থাকার কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের সংকটে গ্রুপের অন্য সফল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণবঞ্চিত করা দেশের শিল্পায়নের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শাস্তি না দিয়ে বরং তারা যেন প্রতিকূলতার মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারে, সরকারকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বতন্ত্র আইনি সত্তা হিসেবে মূল্যায়নের পাশাপাশি দণ্ড সুদের বোঝা চাপানোর সংস্কৃতি বন্ধের দাবিও তুলেছেন তারা।
সোমবার (১২ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা এসব মৌলিক নীতি সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি দল ও বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল (বিআইসি) সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, উচ্চ সুদহার, তীব্র গ্যাস সংকট এবং ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির ফলে অধিকাংশ কারখানা এখন অস্তিত্ব সংকটে। এই মুহূর্তে বন্ধ শিল্পে অর্থ ঢালার চেয়ে যারা এখনো ধুঁকতে ধুঁকতে টিকে আছে, তাদের সুরক্ষা দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
বৈঠকে সিআইবি রিপোর্টে ‘গ্রুপ কনসেপ্ট’ নিয়ে ব্যবসায়ীরা তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে একটি শিল্প গ্রুপের অধীনে একাধিক স্বতন্ত্র আইনি সত্তা (লিগ্যাল এনটিটি) থাকে। বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠান ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে পুরো গ্রুপের সব কটি প্রতিষ্ঠানের সিআইবি রিপোর্ট নেতিবাচক হয়ে যায়। এর ফলে গ্রুপের যে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত কিস্তি দিচ্ছে এবং ভালো ব্যবসা করছে, সেগুলোও নতুন ঋণ বা এলসি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বতন্ত্র আইনি সত্তা হিসেবে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে একটির ব্যর্থতার দায়ে অন্যটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
একইভাবে ঋণের ওপর আরোপিত ‘পেনাল ইন্টারেস্ট’ বা দণ্ড সুদ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন উদ্যোক্তারা। তারা বলেন, গ্যাস সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো পরিস্থিতির কারণে কোনো উদ্যোক্তা অনিচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হলে তার ওপর অতিরিক্ত সুদ চাপানো হয়। এতে ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা গভর্নরকে বলেন, “শিল্প শুধু ব্যক্তির সম্পদ নয়, এটি জাতীয় সম্পদ। তাই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস না করে বরং নীতি সহায়তার মাধ্যমে তাকে দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।”
গভর্নরের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসাইন ও মো. জসীম উদ্দীন, বিসিআই-এর সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, বিসিএমইএ-র চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম স্বপন, বিএমএএমএ সভাপতি মতিউর রহমান, বিজিএপিএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ শাহরিয়ার এবং বিসিআই-এর সহ-সভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী।
আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই শিল্পখাতে কার্যকর মূলধনের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর ওপর গ্যাসের মূল্য ২৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ মেলেনি। টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর ঋণের ‘স্প্রেড’ কমিয়ে শিল্পখাতকে স্বস্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয় ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে হলেও ব্যবসায়ীদের থেকে ১৪-১৫ শতাংশ সুদ নেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।
ব্যবসায়ীরা এলসি সীমা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনেও বিশেষ প্রস্তাব দেন। তারা বলেন, মুদ্রার বিনিময় হার বাড়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের এলসি সীমা অনিচ্ছাকৃতভাবে অতিক্রম করে গেছে। এসব অতিরিক্ত দায়কে আলাদাভাবে ‘ব্লক’ করে দিয়ে মূল সীমাটি সচল রাখলে নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কম সুদে তহবিল সংগ্রহের জন্য বিদেশি রিফাইনান্সিং সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এমএসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। ব্যাংকগুলোর ছোট উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে অনীহার কথা উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা জটিল কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল চালু এবং স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধার প্রস্তাব দেন। গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যবসায়ীদের এসব প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল, পেনাল ইন্টারেস্ট এবং সিআইবি সংস্কারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্বের সাথে কাজ শুরু করেছে।
তহবিল সহায়তা প্রসঙ্গে বিআইসি সভাপতি আরও জানান, রপ্তানি খাতের বকেয়া নগদ সহায়তার অর্থ এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছাড় করার বিষয়ে গভর্নর আশ্বাস দিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, একটি কারখানা একবার বন্ধ হয়ে গেলে সেটিকে পুনরায় চালু করা অত্যন্ত দুরূহ। তাই সচল কিন্তু দুর্বল শিল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থান রক্ষাকরাই এখন সময়ের দাবি।








