বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে বিদেশি বিনিয়োগের দীর্ঘকালীন একক আধিপত্যের অবসান হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো দেশের ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত উদ্যোগে গঠিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ (বিএসআইসি) এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১২ মে) রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে বিএসআইসি-র প্রথম ফান্ড ‘অঙ্কুর বাংলাদেশ ফান্ড ১’ এর উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার (৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রাথমিক মূলধন নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আর্থিক খাতের আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, আর্থিক খাতসহ সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক সেক্টরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।
মন্ত্রী বলেন, “সরকারের কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ বা প্রভাব এখানে কাজ করবে না, এটি হবে শতভাগ পেশাদার প্রতিষ্ঠান। আমরা বর্তমানে একটি ‘পেইনফুল’ বা যন্ত্রণাদায়ক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের পূর্বের ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলতে আমরা সিরিয়াস ডিরেগুলেশন এবং সংস্কারের দিকে এগোচ্ছি।” ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতি দূর করতে বিশ্বখ্যাত জেপি মরগান আবার বাংলাদেশে ফিরছে এবং আইএফসি-ও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে বলে তিনি তথ্য দেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিএসআইসি-র মূলধন কাঠামোটি অত্যন্ত টেকসই ও ধারাবাহিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী, অংশীদার ব্যাংকগুলো প্রতি বছর তাদের নিট মুনাফার ১ শতাংশ এই তহবিলে প্রদান করবে। ফলে এটি কেবল একটি এককালীন তহবিল নয়, বরং স্টার্টআপদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী মূলধন জোগানদাতা হিসেবে কাজ করবে। তহবিলটি মূলত ‘সিড’, ‘লেট-সিড’ এবং ‘সিরিজ-এ’ পর্যায়ের স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ করবে। ২০২৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই প্রথম তিনটি বিনিয়োগ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এই উদ্যোগের সুফল যেন প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণও পায় সেদিকে নজর রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে দেশের একটি বড় অংশ বঞ্চিত থাকবে। এছাড়া ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সক্রিয়ভাবে কাজ করবে।”
২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থায়ন এলেও এর মধ্যে দেশীয় উৎসের অবদান ছিল ৭ শতাংশের কম। এই প্রেক্ষাপটে বিএসআইসি-র চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, “এটি শুধু একটি ফান্ড নয়, এটি এমন একটি পেশাদার প্ল্যাটফর্ম যা আমাদের তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বপ্নকে সুশৃঙ্খল মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করবে।”
অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অঙ্গনের বিশেষজ্ঞ সামি আহমদকে বোর্ডের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। ভেঞ্চারসুক, ওয়েভমেকার পার্টনার্স, ফাইভ হানড্রেড গ্লোবাল এবং এডিবি ভেঞ্চারসের মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অন্তত ১০টি শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বিএসআইসি-র কার্যক্রম শুরু হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।











