বিশ্ব বাজারের চেয়ে ৫০% বেশি দামে পণ্য কিনছেন বাংলাদেশের মানুষ

Web Photo Card May 11 2026 PRI
ছবি: পিআরআই

দেশের সাধারণ ভোক্তারা কেবল ভুল বাণিজ্য নীতির কারণে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, যা দেশের মোট জিডিপির ৫ শতাংশেরও বেশি। আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক ও অহেতুক সুরক্ষাবাদী কাঠামোর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষকে পণ্য কিনতে হচ্ছে অন্তত ৫০ শতাংশ বেশি দামে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে উঠে আসা এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটিই এখন দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার (১১ মে) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘বাণিজ্য নীতি, শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগের প্রভাব ও ভোক্তা কল্যাণ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো কেবল ভোক্তাদের পকেট কাটছে না, বরং শিল্পখাতের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে।

পিআরআই-এর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার তাঁর মূল প্রবন্ধে সতর্ক করে বলেন, সুরক্ষাবাদ কোনো সুবিধা হওয়ার আগে এটি একটি বিশাল ব্যয়, যা আসলে সাধারণ ভোক্তার কাছ থেকে গুটিকয়েক উৎপাদকের কাছে সম্পদের অন্যায্য স্থানান্তর মাত্র।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সংরক্ষণবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের এই সন্ধিক্ষণে শিল্পকে অনির্দিষ্টকাল সুরক্ষা দেওয়া আত্মঘাতী হতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শিল্প গড়ে তোলা যা বিশ্ববাজারে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। কেবল ভর্তুকি বা শুল্কের ওপর নির্ভর করে কোনো অর্থনীতি টেকসই হয় না। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট সমাধান এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে এখন নজর দেওয়ার সময় এসেছে।

ড. জাইদী সাত্তারের উপস্থাপনায় উঠে আসে বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামোর বিচ্ছিন্নতার এক ভয়াবহ চিত্র। বর্তমানে বাংলাদেশে গড় নামমাত্র শুল্কহার ২৮ শতাংশ, যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় (৭ শতাংশ) থেকে চার গুণ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি। এর সঙ্গে যখন রেগুলেটরি ডিউটি বা প্যারা-ট্যারিফ যুক্ত হয়, তখন কার্যকর শুল্ক হার দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ শতাংশে। এই বিশাল শুল্কের বোঝা সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।

বিনিময় হারের অস্থিরতা ও ভুল বাণিজ্য নীতির সমন্বয়হীনতা নিয়ে ড. সাত্তার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ১৯৯২ সালে কাস্টমস ডিউটি ৭০ শতাংশ থাকলেও এখন তা ১৪ শতাংশে নেমেছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে শুল্ক কমানোর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। বরং ২০২২ সালের পর টাকার মান ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস তুলছে।

দেশের শিল্পনীতিতে একটি সুস্পষ্ট ‘রপ্তানি-বিরোধী পক্ষপাত’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ড. সাত্তার উল্লেখ করেন, আমদানি বিকল্প শিল্পে যেখানে ২৮ শতাংশ সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে, সেখানে রপ্তানি খাতে ভর্তুকি বা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৭ শতাংশ। এই অসামঞ্জস্যের কারণেই দেশের অ-গার্মেন্টস রপ্তানি খাত স্থবির হয়ে পড়েছে। নগদ সহায়তা দিয়ে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব নয়, যদি না বাণিজ্য নীতির এই দ্বৈততা দূর করা হয়। তৈরি পোশাক খাত যেভাবে শুল্কমুক্ত কাঁচামালের সুবিধা পায়, অন্যান্য খাতের জন্য সেই দরজা বন্ধ রাখা হয়েছে।

পিআরআই-এর এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মূল্যস্তর বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়েও বেশি। যার ফলে মার্কিন ডলারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশে ভারতের তুলনায় অনেক কম। ড. সাত্তার আক্ষেপ করে বলেন, বাণিজ্য নীতির সবচেয়ে বড় অংশীদার হওয়ার কথা ছিল ভোক্তাদের, কিন্তু বাস্তবে তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। উৎপাদকদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে ভোক্তাদের কল্যাণের স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অন্তরায়।

ভোক্তাদের এই দুর্দশা নিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ.এইচ.এম. শফিকুজ্জামান বলেন, ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সুবিধা দিতে গিয়ে ভোক্তাদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে যৌক্তিক শুল্ক নির্ধারণ এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিআইআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ রপ্তানি বহুমুখীকরণে অতিরিক্ত সুরক্ষাবাদকে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর আমাদের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ বা পিটিএ চুক্তি করতে হবে। তখন এই উচ্চ শুল্ক কাঠামো বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তাই এখনই সময় আমাদের শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা। অতিরিক্ত শুল্ক আমাদের রপ্তানি সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন শুল্ক কাঠামোর বৈষম্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী অত্যধিক সুরক্ষা পেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না। এনবিআরের কাজ হওয়া উচিত নীতি বাস্তবায়ন করা, নীতি নির্ধারণ করা নয়। একটি সমন্বিত শুল্কনীতি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই বিশৃঙ্খলা দূর হবে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বাণিজ্য সংস্কার সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।

ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, যখন পণ্যের দাম বাড়ে, তখন এর প্রভাব গিয়ে পড়ে শিক্ষা ও পুষ্টির ওপর। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের পড়ালেখার খরচ কমিয়ে দিচ্ছে খাবারের সংস্থান করতে। ভোক্তা কল্যাণকে বাণিজ্য নীতির কেন্দ্রে না রাখলে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের একটি রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক ভিশন প্রয়োজন। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে এনবিআর যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিচ্ছে। শুল্কহার কমিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়ালে উল্টো রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। বিনিয়োগ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সমন্বিত নীতি এখন সময়ের দাবি।

বৈঠকে বক্তারা জাতীয় শুল্কনীতি ২০২৩ অবিলম্বে বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। তারা মনে করেন, বাণিজ্য নীতির সঙ্গে বিনিময় হার নীতির সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে রপ্তানি ও আমদানি নীতি আদেশ ইংরেজিতে প্রকাশ করারও পরামর্শ দেওয়া হয়।

পরিশেষে পিআরআই-এর এই গোলটেবিল বৈঠক থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—সুরক্ষাবাদের নামে সাধারণ মানুষের বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অর্থনীতির সুস্থ ধারার জন্য শুল্ক হার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অপরিহার্য। ২০২৬ সালের এলডিসি উত্তরণের আগেই এই সংস্কার কার্যক্রম শেষ করতে না পারলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে তার অবস্থান হারাবে এবং ভোক্তার ভোগান্তি আরও চরমে পৌঁছাবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top