বাংলাদেশের বিদ্যমান লজিস্টিকস খরচ যদি ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে জাতীয় রপ্তানি আয় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সময় মাত্র ১ শতাংশ কমানো গেলে রপ্তানি ৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
শনিবার (৯ মে) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাণিজ্য নির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এ তথ্য তুলে ধরেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ। সভায় লজিস্টিকস খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি দক্ষ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞরা।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামোর কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ক্রমশ বাড়ছে। তিনি বলেন, “আমাদের রপ্তানি মূলত গুটিকয়েক পণ্য ও বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথে প্রধান বাধা হলো সক্ষমতার অভাব এবং উচ্চ লজিস্টিকস খরচ।” তিনি লজিস্টিকস নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, বন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী স্বাগত বক্তব্যে বলেন, লজিস্টিকস খাতের সমন্বয়হীনতার কারণে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় প্রতিনয়ত পিছিয়ে পড়ছে। বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময়, সড়ক ও রেলপথে ধীরগতি এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসের অভাব আমাদের সাপ্লাই চেইনকে ব্যয়বহুল করে তুলছে। তিনি বন্দরগুলোতে ‘পেপারলেস অটোমেটেড’ ব্যবস্থা চালু এবং পিপিপি-এর মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের জোর দাবি জানান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বিআইএম-এর মহাপরিচালক মোঃ সলিম উল্লাহও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হাবিবুর রহমান একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বলেন, “সড়কপথের ওপর চাপ কমাতে রেলপথই একমাত্র ভরসা। অন্তত একটি সমুদ্রবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতকে দেওয়া উচিত। এতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে, সেবার মান বাড়বে এবং শুল্কহার কমবে।”
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোঃ শামসুল হক বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। অবকাঠামো থেকে ইতিবাচক ফল পেতে হলে সেগুলোকে অবশ্যই একে অপরের সাথে সংযুক্ত হতে হবে, অন্যথায় অর্থ ব্যয় হলেও সুফল মিলবে না। তিনি সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের ওপরও জোর দেন।
ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ জানান, পানগাঁও বন্দরে স্ক্যানার মেশিন না থাকায় উদ্যোক্তারা সেখানে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এছাড়া অভ্যন্তরীণ নদীপথের অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় খরচ কমার বদলে উল্টো বাড়ছে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী জানান, স্থলবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাব এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসা পরিচালন ব্যয় ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে।
এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, তারা ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো এবং মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছেন। তিনিও লজিস্টিক সেবার সকল স্তরের ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার নিশ্চিতে জোর দেন।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে লজিস্টিকস সেবার সকল স্তরে ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। লজিস্টিকস খাতের এই আমূল পরিবর্তনই বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে সভায় ঐকমত্য পোষণ করা হয়।













