বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় মাত্র ১০ শতাংশ। বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতির কারণে পণ্য পরিবহনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে একটি ডেনিশ কোম্পানি কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় কাজ শুরু করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানকে বন্দরের কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ আমল থেকে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। তবে উচ্চ আদালতে মামলা ও শ্রমিক নেতাদের বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, লজিস্টিক খাতের এই উচ্চ ব্যয় বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে সংকুচিত করছে। বন্দর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক ব্যয় বৈশ্বিক গড়ের কাছাকাছি নামিয়ে আনতে না পারলে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকা কঠিন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত পণ্য খালাস ও সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের অগ্রাধিকার। এতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে ইতিবাচক বার্তা যাবে।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়েও বিশেষ আলোকপাত করেন। বর্তমানে একজন উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরু করতে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ ধরনের অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে হয়, যা ব্যবসা পরিবেশকে জটিল করে তুলেছে। এই আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করতে মন্ত্রী ‘প্রভিশনাল ক্লিয়ারেন্স’ বা সাময়িক অনুমতিপত্র চালুর ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বিডা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করলেই এই ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাবে, যাতে উদ্যোক্তারা লাইসেন্সের দীর্ঘ অপেক্ষায় না থেকে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত অলস শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বহু বড় শিল্পকারখানা বছরের পর বছর লোকসানি অবস্থায় পড়ে থাকায় সরকারের ওপর বিপুল ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। শিল্প ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রায় ৯০টি অলস শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এসব পরিত্যক্ত বা অলস সম্পদকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করা। আধুনিকায়ন ও আধুনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে এখানে রপ্তানিমুখী উৎপাদনের বিশাল সুযোগ তৈরি করা হবে।
এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে টেকসই সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই বলে সতর্ক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন এবং বিদেশি অপারেটরের সম্পৃক্ততা পণ্য পরিবহন ব্যয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান আরও শক্ত করবে। সরকার চায় দেশীয় শিল্প বিকশিত হোক এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হোক।













