ইসলামী ব্যাংক দখলে এস আলমের সহযোগী হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, “২০১৭ সালে এস আলম যখন ইসলামী ব্যাংক দখল করে, তখন জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে লুটের সহযোগী ছিলেন আজকের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।”
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “লুটেরার সহযোগী হিসেবে যার জেলে থাকার কথা, তিনি আজ বঙ্গভবনে আছেন। জাতি হিসেবে আমরা কতটা আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন যে আমরা মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারছি না—এই প্রশ্ন রেখে গেলাম।”
ইসলামী ব্যাংকের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা যায়, মো. সাহাবুদ্দিন দুই ধাপে প্রায় ছয় বছর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। এস আলমের ‘ছায়া’ কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্স লিমিটেডের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে ২০১৭ সালের জুন মাসে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের পরিচালক হিসেবে পর্ষদে যোগদান করেন এবং ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টানা তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর এক বছর বিরতি দিয়ে ২০২১ সালে ফের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে মনোনীত করা হয়। ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন।
জেএমসি বিল্ডার্স লিমিটেড মূলত এস আলম গ্রুপের একটি কৌশলগত অঙ্গপ্রতিষ্ঠান, যার কোনো প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের চেয়ে আর্থিক খাতের রাজনীতি ও ব্যাংক দখলের প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা ছিল। এমন কয়েকটি কোম্পানির মাধ্যমেই মো. সাহাবুদ্দিনসহ অধিকাংশ পরিচালককে মনোনীত করত এস আলম গ্রুপ, যাদের মাধ্যমে পুরো ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করা যেত।
‘সংশোধিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬: আবারও ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাত’ শীর্ষক ওই বৈঠকে বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা ফেরাতে তিনটি বিষয় জরুরি: চোরদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা, বেনামি ঋণ ও হুন্ডি বন্ধে ক্যাসলেস পদ্ধতি চালু করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা। এছাড়া তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত সমাধান না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া আইনের ১৮(ক) ধারাটি মূলত ব্যাংক লুটেরাদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার পথ তৈরি করে দিয়েছে। তাঁরা বলেন, এই ধারার মাধ্যমে অতীতে যারা পরিকল্পিতভাবে ব্যাংক ধ্বংস করেছে, তারাই এখন নামমাত্র অর্থ দিয়ে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা বিভাগের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, “এই ১৮(ক) ধারা ব্যবহার করে এস আলম ও তার সহযোগীদের প্রধান লক্ষ্য হলো ইসলামী ব্যাংককে আবারও দখল করা। নতুন সংশোধনীর কারণে খুব সামান্য টাকা দিয়েই তারা এটি করতে পারবে।”
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোসতাক খান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ছিল ব্যাংক লুটেরাদের সকল সম্পদ ক্রোক করা। কিন্তু সরকার তা না করে বড় ভুল করেছে। অন্যান্য বক্তারা বলেন, গত দেড় দশকে গুটিকয়েক অলিগার্ক লক্ষ কোটি টাকা লুট করায় ব্যাংকিং খাত এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর মধ্যে এই নতুন আইন আস্থাহীনতা তৈরি করে পুরো অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।
ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী, সিএফএ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসিফ খান, প্রথম আলোর হেড অফ অনলাইন শওকত হোসেন মাসুম ও ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ।













