বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তন এবং সুবিধাবঞ্চিত আড়াই লাখ বিধবা ও নারী উদ্যোক্তার ভাগ্যোন্নয়নে ২৫ কোটি ডলার (প্রায় ২,৭৫০ কোটি টাকা) ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ফিলিপাইনের ম্যানিলায় সংস্থাটির সদর দপ্তরে এই ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। মূলত দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর দক্ষতা বাড়ানো এবং এর আওতা আরও বিস্তৃত করতেই এই বিশাল বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে এডিবি।
বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শক্তিশালী কাঠামোয় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই কর্মসূচিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এডিবির এই সহায়তা ‘সেকেন্ড স্ট্রেনথেনিং সোশ্যাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’-এর সাবপ্রোগ্রাম-২-এর আওতায় দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলো আরও জোরদার করা। বিশেষ করে যারা দারিদ্র্যের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে রক্ষা করতে এই তহবিল সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জং এই ঋণ অনুমোদন প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি আধুনিক এবং সহনশীল কাঠামোয় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই কর্মসূচিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি উল্লেখ করেন, নারীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি অবদানভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের দারিদ্র্য কমবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
এই প্রকল্পের অধীনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। যার মধ্যে অন্যতম হলো অবদানভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা স্কিম বা ‘কন্ট্রিবিউটরি সোশ্যাল প্রটেকশন’ চালু করা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সরকারের ওপর যে বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এটি মূলত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রকল্পের একটি বড় অংশ ব্যয় হবে দেশের বিধবা নারীদের কল্যাণে। বর্তমানে চলমান বিধবা ভাতা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়িয়ে অতিরিক্ত অন্তত ২ লাখ ৫০ হাজার দুস্থ ও বিধবা নারীকে এই নিরাপত্তার আওতায় আনা হবে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং তারা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবেন।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এই প্রকল্পে বিশেষ সুসংবাদ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ বা আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার অন্তত ১৫ শতাংশ বাড়ানো হবে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে মূলধন পাবেন, যা দেশে নারী কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে নতুন গতির সঞ্চার করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এই কর্মসূচি বিশেষ ভূমিকা রাখবে। জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে কর্মসংস্থানভিত্তিক বা ‘ওয়ার্কফেয়ার’ কর্মসূচিতে নতুন নতুন অভিযোজনমূলক উদ্যোগ যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষ যেমন কর্মসংস্থান পাবেন, তেমনি তাদের এলাকাগুলোও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
এডিবি অনুমোদিত ২৫০ মিলিয়ন ডলারের এই ঋণটি একটি ‘নমনীয় ঋণ’ এবং এটি সরাসরি সরকারের বাজেট সাপোর্ট হিসেবে কাজ করবে। এডিবির অফিশিয়াল শর্তানুযায়ী, এই ঋণের সুদের হার বছরে ২ শতাংশ (ফিক্সড)। ঋণটি পরিশোধের জন্য বাংলাদেশ মোট ২৫ বছর সময় পাবে, যার মধ্যে প্রথম ৫ বছর ‘গ্রেস পিরিয়ড’ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ, প্রথম ৫ বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না; ষষ্ঠ বছর থেকে মূল ঋণ ও সুদ কিস্তিতে পরিশোধ শুরু হবে।
এটি একটি ‘পলিসি-বেসড লোন’ (পিবিএল), যার অর্থ হলো নির্দিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের শর্তে এই অর্থ প্রদান করা হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বিধবা ভাতার আওতা অন্তত ২ লাখ ৫০ হাজার জন বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সুবিধা ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা। এই সহজ শর্তের ঋণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আধুনিকায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট ডকুমেন্ট ও এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টরের তথ্যমতে, এই অর্থ সরাসরি সরকারি ট্রেজারিতে জমা হবে।













