ব্যয় কমিয়ে মুনাফার প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে দেশের শীর্ষ টেলিযোগাযোগ অপারেটর গ্রামীণফোন লিমিটেড। বৈশ্বিক নানামুখী সংকটের কারণে আয় কমে যাওয়ার পূর্বাভাস আমলে নিয়ে মুনাফা ধরে রাখতে বিশেষ কৌশল নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ৬৬২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪.৪ শতাংশ বেশি।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে গ্রামীণফোন ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা মোট রাজস্ব আয় করেছে। প্রতিকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিটির আয় কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গ্রামীণফোনের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরিচালনা ব্যয় এবং অবচয়জনিত খরচ হ্রাসের ফলে প্রান্তিক শেষে মুনাফার ধরনে এই উন্নতি এসেছে। গ্রামীণফোনের শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস এই তিন মাসে ৪.৯০ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে গ্রামীণফোনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা অটো রিশ বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও ব্যয়গুলোকে কার্যকরভাবে সামলানোর ফলে আমরা আমাদের পরিচালন মুনাফার মার্জিন বজায় রাখতে পেরেছি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও আমরা আমাদের লভ্যাংশ এবং আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রথম প্রান্তিকের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের মাসখানেক আগেই কোম্পানিটি এক আগাম সতর্কবার্তায় জানিয়েছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে আমদানিকৃত জ্বালানি ও এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা করেছিল গ্রামীণফোন। কোম্পানিটি আগেভাগেই ধারণা করেছিল যে এর ফলে মানুষের খরচ করার ক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত হয়ে আসতে পারে।
মার্চের শেষদিকে দেওয়া ওই ডিসক্লোজারে কোম্পানিটি আরও জানিয়েছিল, প্রতিকূল আবহাওয়া ও তীব্র কালবৈশাখী ঝড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আয় ২ শতাংশ এবং পরিচালন মুনাফা ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে তারা পূর্বাভাস দিয়েছিল। প্রকৃত আর্থিক ফলাফলে কোম্পানিটির সেই পূর্বাভাসের প্রতিফলনই দেখা গেছে।
গ্রামীণফোন তাদের নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে ইনডোর নেটওয়ার্ক এবং গ্রামীণ কভারেজের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটি তাদের মূলধনী বিনিয়োগের একটি বড় অংশই ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কর্মসূচিতে ব্যয় করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে গ্রামীণফোনের মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৪২ লাখে। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৯২ লাখ গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছেন, যা মোট গ্রাহকের ৫৮.৪ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ডিজিটাল সেবার প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
কোম্পানিটি এই তিন মাসে সরকারি কোষাগারে কর, শুল্ক ও লাইসেন্স ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা দিয়েছে। গ্রামীণফোন তাদের খরচ সাশ্রয়ী কৌশল এবং অটোমেশনের মাধ্যমে বাহ্যিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চাপের মধ্যেও তাদের মুনাফার মার্জিন ১৭.৬ শতাংশে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।
গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমান বলেন, বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও শৃঙ্খলার সাথে ৫৮ শতাংশ পরিচালন মুনাফা ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে একটি দক্ষ ও ডিজিটাল কোম্পানি হিসেবে গড়ে উঠতে নেটওয়ার্ক, তরঙ্গ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও জানান, অভ্যন্তরীণ ও গ্রামীণ নেটওয়ার্কের মানোন্নয়নে অতিরিক্ত তরঙ্গ বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। দেশের বৃহত্তম ডিজিটাল ইকোসিস্টেম হিসেবে গ্রামীণফোন গ্রাহকদের পরিবর্তিত জীবনধারার সাথে তাল মিলিয়ে উদ্ভাবনী সমাধান দিয়ে যাবে।













