ব্যাংকিং খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে বিতর্কিত সাবেক মালিক এস আলম গ্রুপসহ অন্যান্যদের পুনরায় ব্যাংকের পর্ষদে ফিরে আসার পথ তৈরি হয়েছে। তবে এই সুযোগ কোনোভাবেই ঢালাও নয়, বরং কঠোর শর্ত এবং আইনি যাচাই-বাছাইয়ের ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার (২২ এপ্রিল) সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ব্যাংকিং আইনের ১৮ক ধারা অনুযায়ী সাবেক মালিক বা পরিচালকরা যদি নিজেদের সংশোধন করেন এবং যাবতীয় দায়দেনা পরিশোধ এবং কঠোর শর্ত পূরণ করলে পূনরায় তাদের ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই সুযোগ কোনোভাবেই ঢালাও নয়, বরং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই তা বাস্তবায়ন করা হবে।
মুখপাত্র বলেন, যেসব ব্যক্তি ব্যাংকের অভিযুক্ত মালিকানা বা পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারা নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পুনরায় মালিকানায় ফিরতে পারবেন। ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন অনুযায়ী, নির্দিস্ট পরিমাণের অর্থ পরিশোধের পরই কেবল তাদের আবেদনের বিষয়টি পরবর্তী ধাপে বিবেচনা করা হবে।
২০২৬ সালের সংশোধিত ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন’ অনুযায়ী, একীভূত বা দুর্বল ব্যাংকের পুরনো পরিচালকরা সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া আর্থিক সহায়তার ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করেই ব্যাংকের মালিকানায় বা নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সুযোগ পাবেন। অবশিষ্ট ৯২.৫ শতাংশ অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করার বিধান রাখা হয়েছে। মালিকানা ফিরে পেতে নতুন মূলধন জোগান দেওয়া, মূলধন ঘাটতি পূরণ করা, আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করা, এবং কর-রাজস্ব পরিশোধের শর্ত মানতে হবে।
যদিও গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এস আলম গ্রুপের সঙ্গে কোনো ধরনের ‘সমঝোতা’র গুঞ্জন সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, লুটেরাদের সঙ্গে আপস করা বর্তমান সরকারের নীতি নয়। যারা ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়েছেন, তাদের সবার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, পুনর্বহালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে একাধিক সংস্থার তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদন অনুযায়ী কারও বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে, সেসব অভিযোগ থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্কৃতি পেতে হবে। অভিযোগমুক্ত হওয়ার পরেই কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
“এ ছাড়া ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য পর্যালোচনায় যদি দেখা যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে, তাহলে তা আগে সমন্বয় করতে হবে। বিধি অনুযায়ী এসব ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউলিং করার প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলেই তারা পুনরায় ব্যাংক পরিচালনায় আসার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, এটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পুনর্বাসন নয়, বরং আইনি পন্থায় সংশোধনের পথ খোলা রাখা।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের মতে, বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো আগামী ১৮ মাসে দেশে ও বিদেশে প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে কিছুটা বাধা তৈরি হওয়ায় এখন দেশেই কর্মসংস্থান বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বন্ধ বা ধীরগতির কলকারখানাগুলো সচল করা বেশি জরুরি বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী জানান, এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ ঋণ ও সুবিধা গ্রহণ করেছে। এর একটি বড় অংশই বর্তমানে খেলাপি বা অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বেনামে এবং পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া নেওয়া এসব ঋণের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
সরকার ইতিমধ্যে গ্রুপটির ৪,২৬৪ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদ, ২,৬৮০টি ব্যাংক হিসাব এবং ২৪,৮১০ কোটি টাকার শেয়ার জব্দ করেছে। পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে চারটি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগসহ ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের সংশোধনী নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পুনর্বাসনের জন্য নয়, বরং ব্যাংকিং খাতে মূলধন প্রবাহ বাড়ানোর একটি ‘নতুন সুযোগ’। তবে এস আলম বা কোনো চিহ্নিত লুটেরা যাতে ছদ্মবেশে মালিকানায় ফিরতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।













