বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিদেশি ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাথে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিসিআই সভাপতি এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের আন্তর্জাতিক সদর দপ্তরগুলো বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন কোনো অর্ডার দিতে নিরুৎসাহিত করছে। জুলাই ও আগস্ট মাসের জন্য যেসব ক্রয়াদেশ আসার কথা ছিল, সেগুলোর গতি এখন অত্যন্ত মন্থর হয়ে পড়েছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার আসা বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে ভারতসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বড় ক্রয়াদেশ বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে এসব দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা বাংলাদেশের জ্বালানি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছেন।
এদিকে জ্বালানির অনিশ্চয়তা ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ভয়াবহ ধস নেমেছে। গত মার্চ মাসে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে ১৮.৭ শতাংশের বড় পতন ঘটেছে, যা গত আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ২,৮৫৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫.৫১ শতাংশ কম। শুধুমাত্র মার্চ মাসেই এ খাতে রপ্তানি আয় কমেছে ১৯ শতাংশ। ।
এনবিআরে আজকের আলোচনায় জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বর্তমান কর কাঠামো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ব্যবসায় লোকসান হলেও বর্তমানে ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হচ্ছে, যা বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্তরভিত্তিক বা স্ল্যাব-ভিত্তিক কর ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন।
পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের ওপর উৎস কর কমানোর দাবি জানানো হলেও এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান তাৎক্ষণিকভাবে তা নাকচ করে দেন। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত করের চাপে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
আয়কর আইন ২০২৩-এর বিশেষ কিছু ধারা নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। কর কর্মকর্তাদের কম্পিউটার সিস্টেম বা নথিপত্র জব্দ করার অবারিত ক্ষমতা নিয়ে বিসিআই সভাপতি বলেন, কর যাচাইয়ের নামে এ ধরনের কঠোর নিয়ম ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে এই আইনগুলোতে সংস্কার আনা জরুরি।
সভায় ঢাকা চেম্বারের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন এবং ব্যাংক আমানতের মুনাফার ওপর উৎস কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার দাবি জানান। সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর ব্যবস্থার সংস্কার না হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাতগুলো দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে।













