সক্ষমতা না বাড়িয়ে এলডিসি থেকে বের হবে না বাংলাদেশ

Web Photo April 5 2026 LDC
ছবি: অর্থ মন্ত্রণালয়

দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে ‘ভঙ্গুর’ আখ্যা দিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের কোনো সুযোগ নেই। রবিবার (৫ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি এবং বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপে অর্থনীতি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। এই পরিস্থিতিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে এলডিসি থেকে বের হওয়া আত্মঘাতী হবে।

শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভা শেষে সাংবাদিকদের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। বর্তমানে সরকারকে প্রতিদিন অর্থনীতির ক্ষরণ থামাতে ‘ফায়ার ফাইটিং’ বা জরুরি উদ্ধার অভিযান চালাতে হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ‘স্যালভেজ অপারেশন’ বা ডুবন্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি জানান, প্রায় সব অর্থনৈতিক সূচক এখন নিম্নমুখী এবং সরকারি তহবিলে রীতিমতো রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই বহুমুখী চাপ সামাল দিয়ে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখাই এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমির খসরু জানান, ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা সম্ভব নয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গত ফেব্রুয়ারি মাসে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার জন্য জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে পাঠানো ওই চিঠিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে।

মন্ত্রীর মতে, বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ দেনার উচ্চ সুদহার এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখন বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনে নতুন কোনো অর্থায়নের ক্ষেত্রে ‘কস্ট অব ফাইন্যান্সিং’ বা ঋণের ব্যয়ের বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের অপরিকল্পিত ঋণের বোঝা পরিশোধ করাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সক্ষমতা বৃদ্ধি বা ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’ ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে দেশ শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক বাজারে নানা সুবিধা হারাবে, যা অর্থনীতির জন্য আরও আত্মঘাতী হতে পারে।

জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ বা শিল্প খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। সরকার জনগণের ওপর হুট করে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে চায় না, তবে দীর্ঘদিন উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির চাপ বহন করা সরকারি তহবিলের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে যাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমানে সরকারের অগ্রাধিকার এলডিসি উত্তরণ নয়, বরং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করা। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণসহ সাধারণ মানুষের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আগে পূরণ করতে চায় সরকার। এসব সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের সক্ষমতা তৈরি হলে তবেই এলডিসি উত্তরণ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি মনে করেন, সক্ষমতা না বাড়িয়ে এলডিসি থেকে বের হওয়া হবে একটি কাগুজে অর্জন, যা সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসবে না।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশ এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পেয়ে আসছে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশ উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করলেও বর্তমান প্রতিকূল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদনটি পর্যালোচনা করবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top