দেশের প্রান্তিক কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসলের ওপর ভর করে সস্তা ঋণের যে তহবিল সরকার গড়েছে, সেখানে এখন ভাগ বসাচ্ছে করপোরেট দানবেরা। সরকার বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা সুদ ভর্তুকি দিচ্ছে যাতে কৃষক ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে যে, এই ভর্তুকির একটি বিশাল অংশ আসলে কৃষকের কাছে পৌঁছানোর আগেই ‘আইনি পন্থায়’ চলে যাচ্ছে বড় শিল্পপতিদের হাতে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৭৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ শতাংশ বা ১৫ হাজার ২৭৮ কোটি টাকাই গিলে খেয়েছে ১০ কোটি টাকা বা তারও বেশি সম্পদশালী গ্রাহক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও বিশদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫০ কোটি বা তারচেয়ে বেশি সম্পদশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ৬ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা এবং ১০ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৮ হাজার ৮২১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে কোটিপতি গ্রাহককে মোট কৃষিঋণ দেওয়া হয়েছে ২২ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট কৃষিঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ।
অথচ নীতিমালা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণের সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ বরাদ্দ থাকার কথা ছিল। এছাড়া শস্য ও ফসল খাতে বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ সরাসরি সাধারণ কৃষকের পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে সরাসরি পৌঁছেছে মাত্র ১৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের একটি নগণ্য অংশ।
ব্যাংকিং নীতিমালায় ‘কৃষিভিত্তিক শিল্প’ বা অ্যাগ্রো-প্রসেসিং ইউনিটকে কৃষিঋণের আওতায় রাখা হয়েছে। এই সুযোগটিকেই হাতিয়ার করছে বড় করপোরেট গ্রুপগুলো। তারা একটি চালকল বা ডেইরি ফার্মের লাইসেন্স দেখিয়ে ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে। বড়রা এই টাকা নিয়ে তাদের অন্য অকৃষি ব্যবসায় ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ হিসেবেও ব্যবহার করছে, যা কার্যত এক ধরনের ‘মানি লন্ডারিং’ বা ফান্ডের অপব্যবহার। প্রভাবশালীরা ব্যাংক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কৃষি খাতের লেবাসে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সরাসরি কৃষককে ঋণ দেওয়ার চেয়ে ব্যাংকগুলো এনজিও বা ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ব্যাংকগুলো সরকারের কাছ থেকে ১-২ শতাংশ সুদে তহবিল পায়, যা তারা এনজিওদের দেয় ৪-৫ শতাংশ হারে। সেই একই টাকা এনজিওগুলো কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয় ১৮ থেকে ২৪ শতাংশ চড়া সুদে। মাঝখান থেকে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির পুরো ফায়দা লুটছে ব্যাংক ও এনজিও সিন্ডিকেট; কৃষক থাকছে সেই তিমিরেই।
অনেক বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা নিজেরাই বিভিন্ন বড় গ্রুপের মালিক। তারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে কৃষিঋণের বড় বড় লট নিজেদের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ করে নিচ্ছেন। যেহেতু বড় লোন ডিল করলে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ‘টার্গেট’ দ্রুত পূরণ হয় এবং ঝামেলা কম থাকে, তাই তারা ১০ জন কৃষককে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার চেয়ে একজন করপোরেট গ্রাহককে ১০ কোটি টাকা দিতেই বেশি আগ্রহী। এতে কাগজের কলমে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে, কিন্তু মাঠের কৃষকের ভাগ্যে জুটছে কেবল শূন্য।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে এক হাজার কোটি টাকা বেশি। সাধারণভাবে এই ঋণের সুদহার ৮-৯ শতাংশ হলেও বিশেষ খাতের ঋণে (আমন, আউশ, বোরো, ডাল, তৈলবীজ, মসলা ও ভুট্টা) সরকার ভর্তুকি দেয় যাতে ৪ শতাংশ বা তার কম সুদে রেয়াতি ঋণ দেওয়া যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিতে ভর্তুকি দিতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয় (যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় ১৭ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি বরাদ্দের পক্ষে মত দিয়েছিল)। এই ভর্তুকির মধ্যে সুদ ছাড়াও সার ও সেচ খাত অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “বরাদ্দের বেশি ঋণ কোনো খাতে যাওয়ার কথা নয়। এটি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নীতিমালার আওতায় যে কেউ ঋণ নিতে পারেন, তবে যদি কেউ কৃষির নাম করে অন্য খাতে অর্থ ব্যবহার করেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একক গ্রাহক ঋণ সীমা ফাঁকি দিতে বড় গ্রুপগুলো তাদের সহায়ক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে ভিন্ন নামে ঋণ নেওয়ায় দায়সারা তদন্তের ফলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
যখন প্রকৃত কৃষক ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পান না, তখন তিনি বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নেন। এর ফলে তার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে সরাসরি বাজারের ওপর। অর্থাৎ, একদিকে কোটিপতিরা কৃষকের ভর্তুকি চুরি করছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে চড়া দামে চাল-ডাল কিনতে হচ্ছে। সরকারের দেওয়া ভর্তুকি সাধারণ মানুষের জীবন সহজ করার বদলে উল্টো বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে।













