তৈরি পোশাকের বাইরেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি ভিন্ন জগৎ তৈরি হচ্ছে, যা অনেকেরই অজানা। সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হেমোডায়ালাইজার বা কৃত্রিম কিডনি রপ্তানি শুরু করেছে কিছু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে ৬৮ হাজার ৫০০ ডলার মূল্যের কৃত্রিম কিডনি রপ্তানি হয়েছে, যার একমাত্র গন্তব্য ছিল চীন। বাজারটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এটি বাংলাদেশের উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য রপ্তানিতে এক বিশাল মাইলফলক।
বর্তমানে দেশে জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র—এই দুটি প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম কিডনি উৎপাদন করছে। এর মধ্যে বড় অংশটি উৎপাদন করছে জেএমআই, যারা জাপানের নিপ্রো করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে সিরিঞ্জ ও আইভি ক্যানুলার মতো সরঞ্জাম এশিয়া ও ইউরোপে রপ্তানি করছে। এখন তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে তৈরি ডায়ালাইজার বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে, সাশ্রয়ী মূল্যে সাধারণ মানুষের সেবা দিতে সাভারে কারখানা স্থাপন করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। তারা বড় পরিসরে বাণিজ্যিক রপ্তানিতে পিছিয়ে থাকলেও গুণগত মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম কিডনি বা হেমোডায়ালাইজার রপ্তানি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। ২০২৪ সালে ১২-১৫ বিলিয়ন ডলারের এই বৈশ্বিক বাজার ২০৩২ সাল নাগাদ ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি বছর এই সরঞ্জামের চাহিদা ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে।
চীনের মতো শীর্ষস্থানীয় উৎপাদনকারী দেশে বাংলাদেশি হেমোডায়ালাইজার রপ্তানি হওয়া আমাদের পণ্যের আন্তর্জাতিক মানেরই স্বীকৃতি। ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ রয়েছে। উৎপাদনের সক্ষমতা ও মান ঠিক রাখতে পারলে তৈরি পোশাক ও চামড়ার পাশাপাশি এটিও হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী ‘হাই-টেক’ রপ্তানি খাত, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে। মূলত কম খরচে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করতে পারাই হবে এই খাতে বাংলাদেশের মূল শক্তি।
চীনে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের চাহিদাও আকাশচুম্বী। বিশেষ করে কাঁকড়া ও কুঁচে মাছ এখন দেশটির ভোজনরসিকদের তালিকায় শীর্ষে। গত ৯ মাসে জ্যান্ত কুঁচে রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে জ্যান্ত ও ফ্রেশ কাঁকড়া, যার রপ্তানি আয় ৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি পশুর পালকের মতো প্রাণীজ উপজাত রপ্তানি থেকেও ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় হয়েছে।
একসময়ের সোনালি আঁশ পাট তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাচ্ছে চীনের হাত ধরে। দেশটিতে পাটের সুতা ও কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। ৯ মাসে কেবল সিঙ্গেল জুট ইয়ার্ন রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৮ লাখ ডলারের। এ ছাড়া মাল্টিপল সুতা, কাঁচা পাট ও পাটের বর্জ্যও বিপুল পরিমাণে চীনে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের পাট খাতের জন্য নতুন আশার আলো।
চামড়া ও রাসায়নিক খাতেও চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। গত ৯ মাসে প্রায় ২ কোটি ৮১ লাখ ডলারের প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি হয়েছে। পাশাপাশি তামা বা কপার স্ক্র্যাপ রপ্তানি হয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ ডলারের এবং জিংক অবশিষ্টাংশ থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। এই রাসায়নিক পণ্যগুলো চীনের শিল্পকারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ্বের শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও চীনের বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। বিশেষ করে কটন টি-শার্ট রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের। এ ছাড়া কটন সুতা এবং পুরুষদের ট্রাউজার রপ্তানিতেও বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। অপ্রচলিত পণ্যের মধ্যে মানুষের চুল ও পরচুল রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ ডলার। এমনকি খেলনা ও পুতুল রপ্তানি থেকেও প্রায় ১১ লাখ ডলার আয় হয়েছে।













