তীব্র তারল্যসংকট কাটিয়ে গ্রাহকদের লেনদেন স্বাভাবিক রাখতে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-কে আরও ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বুধবারের এই বিশেষ তারল্য সহায়তাসহ গত মাত্র চার কর্মদিবসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ধাপে ধাপে মোট ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধার নিল বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ এই ব্যাংকটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে ভয়াবহ ঋণ অনিয়ম, বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতার কারণে ইসলামী ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে পড়ে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন ও দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জরুরি ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। এর পরপরই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের পাশাপাশি এই বড় অঙ্কের তহবিল জোগান দিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
তহবিল সহায়তার ধারাবাহিকতায় গত রবিবার প্রথম দফায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর আমানত তুলে নেওয়ার তীব্র চাপ সামলাতে গত সোমবার দ্বিতীয় দফায় আরও আড়াই হাজার কোটি টাকা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং আজ বুধবার আরও ১ হাজার কোটি টাকা ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যার ফলে চার দিনে ধারের মোট অঙ্ক সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
এদিকে, ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আজ বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। বৈঠক শেষে সংগঠনটির নেতারা ব্যাংকটির সুরক্ষায় সাত দফা দাবি উত্থাপন করেন।
গ্রাহক ফোরামের অন্যতম প্রধান দাবি হলো—বিগত সময়ে অনিয়ম ও অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকটি যেভাবে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, সেই বিতর্কিত গোষ্ঠীর হাতে থাকা ইসলামী ব্যাংকের সমস্ত শেয়ার হয় আগের প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে, নয়তো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) পদ্ধতিতে দ্রুত শেয়ারবাজারে বিক্রি করে দিতে হবে। এর মাধ্যমেই কেবল ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামোয় প্রকৃত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
বৈঠক শেষে ফোরামের নেতারা আরও জানান, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে পুনরায় ব্যাংকে পুনর্বহালের বিষয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের আশ্বস্ত করেছে। দেশের বিদ্যমান আইন ও ব্যাংকিং বিধিবিধান অনুযায়ী এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর পাশাপাশি ব্যাংকের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রফেশনাল পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছে বলে দাবি করেছে গ্রাহক ফোরাম।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদে বিতর্কিত ও জোরপূর্বক বড় পরিবর্তনের পর থেকেই ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নানা স্ক্যান্ডাল তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এস আলম গ্রুপের একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার, বেনামি ও ভুয়া কাগুজে কোম্পানি খুলে বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
বিগত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটিকে বাঁচাতে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনসহ আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও লুণ্ঠনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে ব্যাংকটিকে এখনও তীব্র তারল্যসংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকটির ভেতরে সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।











