দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের ভয়ংকর চিত্র আড়াল করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ‘ঋণ পুনঃতফসিল’ (লোন রিশেডিউলিং) সুবিধা। তবে চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, দফায় দফায় বিশেষ ছাড় দিয়ে পুনঃতফসিল করা এই বিপুল পরিমাণ ঋণের একটি বড় অংশই শেষ রক্ষা হচ্ছে না এবং প্রায় ৪০ শতাংশ ঋণই আবারও খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন’ থেকে দেশের ব্যাংক খাতের এই কৃত্রিম ও ভঙ্গুর চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালেন্স শিটে খেলাপি ঋণের অঙ্ক কম দেখাতে এবং প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ খাতায় ‘নিয়মিত’ রাখার সুযোগ দিতে দেদারসে পুনঃতফসিল সুবিধা বিলি করছে।
এর ধারাবাহিকতায় শুধু বিদায়ী ২০২৫ সালেই রেকর্ড ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যা বিগত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর ফলে দেশের ব্যাংক খাতে মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পুঞ্জীভূত পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়ে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
মাত্র এক বছর আগেও (২০২৪ সাল শেষে) যার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বর্তমানে এই পুনঃতফসিলকৃত ঋণের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৫৭ শতাংশই কুক্ষিগত রয়েছে দেশের শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের ভেতরে।
বিগত ৫ বছরের পুনঃতফসিল ঋণের গ্রাফিক্সের তথ্য পর্যালোচনা করলে এই প্রবৃদ্ধির কড়া বাস্তবতার প্রমাণ মেলে। ২০২১ সালে যেখানে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা, সেখানে ২০২২ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকায়।
এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে এই অঙ্ক আরও বড় হয়ে ৭৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমে ৫৯ হাজার ৯২০ কোটি টাকা হলেও, সর্বশেষ ২০২৫ সালে তা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার চূড়া স্পর্শ করেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে political মদদে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর উদ্দেশ্যে পুনঃতফসিল নীতিমালা দফায় দফায় শিথিল করা হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২২ সালে ঋণ পুনঃতফসিলের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ব্যাংকের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পর এই অনৈতিক প্রবণতা মহামারির রূপ নেয়।
বর্তমানেও তথাকথিত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নামে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট বা এককালীন অর্থ জমা সাপেক্ষে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার ঢালাও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই বিশেষ সুবিধায় ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে এবং প্রথম দুই বছর কিস্তি পরিশোধ না করলেও চলে—এমন ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা অবকাশ সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই পুনঃতফসিলের প্রকৃত কার্যকারিতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। কারণ কৃত্রিমভাবে কাগজের কলমে নিয়মিত করা এই ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই পরবর্তী সময়ে কিস্তি দিতে ব্যর্থ হয়ে আবারও খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।
খাতভিত্তিক গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকের টাকা নিজেদের পকেটে রাখতে সবচেয়ে বেশি পুনঃতফসিল সুবিধা নিয়েছেন শিল্প খাতের বড় বড় উদ্যোক্তারা। মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশই এককভাবে শিল্প খাতের। এরপরই দেদারসে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত, চলতি মূলধন, আমদানি অর্থায়ন এবং পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য খাতে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এই পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে ব্যাংকের জন্য কোনো ‘সুস্থ সম্পদ’ মনে করে না, বরং একে ‘স্ট্রেসড লোন’ বা চরম দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে অফিশিয়ালি খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। এখন এই অফিশিয়াল খেলাপি ঋণের সঙ্গে যদি পুনঃতফসিলকৃত ৪.৪৭ লাখ কোটি টাকা এবং হিসাবের বাইরে থাকা অবলোপন করা (রাইট-অফ) ঋণ যোগ করা হয়, তবে দেশের ব্যাংক খাতের প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫ ৯০ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঢালাও পুনঃতফসিল সুবিধা দিয়ে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের প্রকৃত কুৎসিত চিত্র আড়াল করা সম্ভব হলেও, এটি সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এর মাধ্যমে আদায়ের অযোগ্য ও মন্দ ঋণকে বছরের পর বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের এই পুঞ্জীভূত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় দেশের সামষ্টিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র জেনুইন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই মহাসংকট মোকাবিলায় কেবল আইনি ফাঁকফোকর তৈরি না করে ঋণ আদায়ে কঠোরতা, ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ইচ্ছাকৃত ও প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।











