৫ বছরে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনতে চায় অ্যামচেম

DSJ Web Photo AmChamBangladesh
ছবি- অ্যামচেম

বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ আরও স্থিতিশীল হলে আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশে আরও ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আনতে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা, কর ও কাস্টমস ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ এবং সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে অ্যামচেমের নির্বাহী কমিটির প্রতিনিধিদল এ অঙ্গীকারের কথা জানায়। অ্যামচেম সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে।

বৈঠকে অ্যামচেম জানায়, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরিতে সংগঠনটি কাজ করে আসছে। বর্তমানে অ্যামচেমের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে দেশের কর রাজস্বের ২০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় বলেও সংগঠনটি জানায়।

সংগঠনটির হিসাবে, এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। ভবিষ্যতে বিদ্যমান মার্কিন বিনিয়োগকারী এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে—এমন নতুন কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করে আরও বিনিয়োগ আনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে অ্যামচেম।

এ জন্য আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনতে সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে সংগঠনটি। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতির স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ বলে বৈঠকে তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোরও প্রশংসা করেছে অ্যামচেম। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংস্কার প্যাকেজে বিনিয়োগ সহজ করতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে সংগঠনটি নির্ধারিত সময়ে অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান, সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, কমপ্লায়েন্সের চাপ কমানো, মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

অ্যামচেমের মতে, এসব সংস্কার শুধু ব্যবসার খরচ কমানোর জন্য নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংস্কার ঘোষণার পাশাপাশি সেগুলোর ধারাবাহিক ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন বড় বিষয়।

বৈঠকে ডিজিটাল অর্থনীতির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। অ্যামচেম পিডিপিএ ও এনডিজিএ প্রণয়নকে স্বাগত জানিয়ে এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও গ্রহণের প্রস্তুতি, সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি খাতে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্পষ্টতার ওপর গুরুত্ব দেয়।

সংগঠনটি মনে করে, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা গেলে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল উদ্ভাবন ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোকেও একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে অ্যামচেম। সংগঠনটির মতে, এর মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে অ্যামচেম শুধু বাজারে প্রবেশাধিকারকেন্দ্রিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে। এর আওতায় প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল উদ্ভাবন, ক্লাউড ও সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনবিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন এবং আর্থিক খাতের আধুনিকায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে আরও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছে অ্যামচেম। এ জন্য একটি ডিজিটাল ইকোনমি অ্যাডভাইজরি ফোরাম বা টাস্কফোর্স এবং একটি পাবলিক-প্রাইভেট কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত দুটি প্ল্যাটফর্মে সরকার, দেশীয় ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অ্যামচেমের প্রতিনিধিত্ব রাখার কথা বলা হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত, সংস্কারের বাস্তবায়ন তদারক এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর কাজ করা যেতে পারে বলে সংগঠনটি মনে করে।

অ্যামচেম জানিয়েছে, তারা সরকারের কাছে শুধু নীতিগত দাবি বা সুপারিশ তুলে ধরতে চায় না; বরং কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী। বিনিয়োগকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে তুলে ধরা, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা, যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সংগঠনটি ভূমিকা রাখতে চায়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অ্যামচেমের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংগঠনটির ভূমিকার প্রশংসা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা সরকারের অগ্রাধিকার। চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি জানান।

নীতির স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা, দক্ষ প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে নিয়মিত ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়ানোর আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে অ্যামচেমের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

বৈঠকে অ্যামচেমের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে আয়োজিতব্য ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সরকারের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।

অ্যামচেমের প্রতিনিধিদলে সভাপতির সঙ্গে ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ ও ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা উর রহমান মাহমুদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া প্রমুখ।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top