৩০ লাখ ডলারের আমদানিতে ২৪ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে

ডিএসজে
ডিএসজে আর্কাইভ

বড় অঙ্কের আমদানিতে এবার আগেই নজরদারি বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি মূল্যের পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তথ্য জানাতে হবে। শুধু আমদানির অঙ্ক নয়, পণ্যের প্রকৃত বাজারমূল্য, আমদানিকারক-রপ্তানিকারকের ব্যবসায়িক পরিচয়, পণ্যের মান ও আট সংখ্যার এইচএস কোড—সবকিছুই যাচাইয়ের আওতায় আনছে নতুন বিধান।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ থেকে এফইপিডি-১ সার্কুলার নম্বর-৩০ জারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত বছরের ১৪ আগস্ট জারি করা এফই সার্কুলার নম্বর-৩৩ হালনাগাদ ও একীভূত করা হয়েছে। তবে সরকারের আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ লাখ ডলার বা তার বেশি মূল্যের আমদানির আগাম তথ্য দেওয়ার এই বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হবে না।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলার বা অনুমোদিত আমদানি কার্যক্রম শুরুর আগে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংককে আমদানিকারকের কাছ থেকে মূল ইনডেন্ট, প্রোফর্মা ইনভয়েস, ক্রয় বা বিক্রয় চুক্তি সংগ্রহ করতে হবে। এসব নথির ভিত্তিতে প্রাথমিক আমদানি তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন ইমপোর্ট মনিটরিং সিস্টেমে (ওআইএমএস) দিতে হবে। একই সঙ্গে কমার্শিয়াল ইনভয়েস ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথির তথ্যও নির্ধারিত পদ্ধতিতে আপলোড করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আমদানি পণ্যের ঘোষিত বা চুক্তিভিত্তিক মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের দায়িত্ব এডি ব্যাংকের ওপর দেওয়া হয়েছে। এলসি খোলার আগে কিংবা আমদানি কার্যক্রম শুরুর আগে ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হবে—আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক প্রকৃত ব্যবসায়ী কি না, রপ্তানিকারক দেশটি সংশ্লিষ্ট পণ্যের নিয়মিত রপ্তানিকারক কি না এবং ঘোষিত মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক কি না।

পণ্যের মূল্য ও পরিচয় যাচাইয়ে নথিপত্রেও আনা হয়েছে বাড়তি শৃঙ্খলা। প্রোফর্মা ইনভয়েস বা ইনডেন্টে পণ্যের গুণমান, ব্র্যান্ড, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেজিং, গ্রেড, একক মূল্য ও পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। একই ইনভয়েসে একাধিক ধরনের পণ্য থাকলে প্রতিটি পণ্যের তথ্য আলাদাভাবে দিতে হবে।

একই সঙ্গে সব পণ্যের পরিমাণ একই এককে দেখানোর সুযোগ থাকছে না। পণ্যের ধরন অনুযায়ী কেজি, লিটার, পিস বা উপযুক্ত অন্য এককে পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট লেনদেনে ব্যবহৃত ইনকোটার্মস অনুযায়ী পরিবহন ব্যয়ের তথ্যও স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে।

আমদানি পণ্যের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করতে ছয় সংখ্যার এইচএস কোডের পরিবর্তে মোট আট সংখ্যার এইচএস কোড উল্লেখের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, মূল্য যাচাই এবং পরবর্তী শুল্ক-কর নির্ধারণে তথ্যের নির্ভুলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন সার্কুলারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে ইউনিফর্ম কাস্টমস অ্যান্ড প্র্যাকটিস বা ইউসিপির সর্বশেষ প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। ডকুমেন্টারি কালেকশনের ক্ষেত্রে ইউনিফর্ম রুলস ফর কালেকশনস বা ইউআরসির সর্বশেষ সংস্করণ অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সঙ্গে বাংলাদেশের স্থানীয় আইন বা বিধানের কোনো বিরোধ হলে দেশের স্থানীয় আইনই প্রাধান্য পাবে।

পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আমদানি ও রপ্তানিকারক নিবন্ধন আদেশ, ২০২৩ অনুযায়ী আমদানিকারককে প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত হতে হবে। নিবন্ধন না থাকলে কিংবা নিবন্ধন থেকে অব্যাহতি না পেলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দেশে পণ্য আমদানি করতে পারবে না।

এডি ব্যাংকগুলোকে অনুমোদনযোগ্য সব আমদানি লেনদেনের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন ইমপোর্ট মনিটরিং সিস্টেমে দৈনিক বা নির্ধারিত নিয়মিত ভিত্তিতে রিপোর্ট করতে হবে। এলসি ছাড়া অনুমোদিত সীমার মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রেও নির্ধারিত পদ্ধতিতে তথ্য দিতে হবে।

আমদানি পণ্যের পরিবহন ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহের বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এফওবি বা এ ধরনের শর্তে আমদানির ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সনদ ইস্যু সহজ করতে সংশ্লিষ্ট চালানের পরিবহন ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্টের ক্ষমতাবলে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। আমদানি লেনদেনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নিয়মের পাশাপাশি আমদানিকারকদের আমদানি নীতি, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ, কর ও শুল্কসহ দেশের অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

নতুন একীভূত সার্কুলারে শুধু বড় আমদানির আগাম তথ্য দেওয়ার বিধানই নয়, আমদানি বাণিজ্যের বিস্তৃত কাঠামোও এক জায়গায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এলসি খোলা ও অর্থ পরিশোধ, সরবরাহকারী ও ক্রেতার ঋণে আমদানি, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন, ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য দলিল, রপ্তানি আয় দিয়ে আমদানি বিল পরিশোধ, বিশেষায়িত অঞ্চল ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে আমদানি, স্বর্ণ-রুপা ও গহনা আমদানি এবং ফরোয়ার্ড রেট চুক্তিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্দেশনা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, গত বছরের ১৪ আগস্টের এফই সার্কুলার নম্বর-৩৩ জারির পর আমদানি লেনদেন নিয়ে জারি করা সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাগুলো একত্র করে নতুন সার্কুলারটি তৈরি করা হয়েছে। নতুন সার্কুলারের নির্দেশনাগুলো জারির তারিখ থেকে এক বছর কার্যকর থাকবে।

তবে গাইডলাইনস ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশনসের ভলিউম-২-এ থাকা আমদানি রিপোর্টিং-সংক্রান্ত নির্দেশনা বহাল থাকবে। পরবর্তী সময়ে জারি করা কোনো নির্দেশনার সঙ্গে নতুন সার্কুলারের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে মূল সার্কুলারে থাকা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপে বড় আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার আগেই লেনদেনের তথ্য, পণ্যের মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে। এর ফলে অতিমূল্যায়ন, ভুয়া বাণিজ্যিক লেনদেন কিংবা আমদানি তথ্যের অসঙ্গতি শনাক্তে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে ব্যাংকগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে তথ্য যাচাই ও অনলাইন রিপোর্টিং সম্পন্ন করতে পারে তার ওপর।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top