শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-সংকট, অন্তত ৬০০ পোশাক কারখানায় টানা ছুটি

DSJ Web Photo GasCrisis
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

গ্যাসের তীব্র সংকট এখন শুধু উৎপাদন কমাচ্ছে না, দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের উৎপাদন পরিকল্পনাই বদলে দিচ্ছে। সীমিত গ্যাস সরবরাহে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে অন্তত ২০ শতাংশ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা তিন থেকে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। এতে একদিকে হাজারো শ্রমিক গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পেলেও, অন্যদিকে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিল্পমালিক, শিল্প পুলিশ, তিতাস গ্যাস, পোশাকশিল্প উদ্যোক্তা এবং খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস-সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে। সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত এক বা দুই দিনের ‘ব্রিজ হলিডে’ যুক্ত করে বহু কারখানা উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি কারখানায় দীর্ঘ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ অন্তত ৬০০টির বেশি কারখানা এ সিদ্ধান্তের আওতায় এসেছে।

বিজিএমইএর একজন জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জানান, সরকারি দুই দিনের ছুটির সঙ্গে একটি অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত করে তাঁদের কারখানায় তিন দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব কারখানায় বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা নেই, সেখানে গ্যাস-সংকট উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে কিছু কারখানায় কাজের চাপও কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত ছুটির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, আগে থেকেই অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা সমন্বয় করে নেওয়ায় এতে শ্রম আইনগত কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তাঁর নিজের কারখানাসহ সংগঠনের প্রায় অর্ধেক সদস্য কারখানাই তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। গ্যাস-সংকট ও উৎপাদন কমে যাওয়াই এ সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ বলে তিনি জানান।

গাজীপুরের একাধিক কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে নিয়মিত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এতে রপ্তানি পণ্য নির্ধারিত সময়ে জাহাজীকরণে বিলম্ব হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শিল্প পুলিশ জানায়, শুধু গাজীপুরেই প্রায় ২০ শতাংশ কারখানা বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চার দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (শিল্প পুলিশ) গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, ছুটির মধ্যেও অনেক কারখানা চালু রয়েছে। তবে গ্যাস-সংকটে উৎপাদন সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত করায় অনেক শ্রমিক পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন।

চার দিনের ছুটির ঘোষণার পর মঙ্গলবার রাত থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, কোনাবাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা ও ভোগড়া এলাকায় ঈদের মতো যাত্রীচাপ দেখা যায়। উত্তরাঞ্চলগামী বাসগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়। অনেক শ্রমিক অভিযোগ করেন, কিছু পরিবহন স্বাভাবিক ভাড়ার দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করেছে।

কারখানা শ্রমিক সানোয়ার হোসেন বলেন, কাজ না থাকলে কারখানায় বসে থাকার চেয়ে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি যেতে পারা ভালো। তবে দ্রুত গ্যাস-সংকটের সমাধান হলে আবার স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন শুরু হবে বলে তিনি আশা করেন।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিতাস গ্যাসের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. সাইফুজ্জামান বলেন, সরবরাহ বাড়াতে কাজ চলছে। তবে বর্তমানে গ্যাসের স্বল্পচাপ পুরোপুরি কাটেনি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-সংকট নতুন নয়। এতদিন কারখানাগুলো উৎপাদন লাইন কমিয়ে, রাতের শিফট বাড়িয়ে কিংবা বিকল্প ব্যবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন উৎপাদন অব্যাহত রাখার পরিবর্তে ছুটি ঘোষণা করাও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হয়ে উঠেছে।

তাঁদের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে শুধু উৎপাদন নয়, রপ্তানি সরবরাহের সময়সূচি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও চাপ আরও বাড়তে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top