২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করতে দেওয়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অধিকাংশ নীতি ও খাতভিত্তিক প্রস্তাব প্রতিফলিত হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। বিডার হিসাবে, তাদের দেওয়া ১৭টি নীতি ও খাতভিত্তিক সুপারিশের মধ্যে ১৪টি এবং ১৯টি নিয়ন্ত্রণ শিথিল (ডিরেগুলেশন) প্রস্তাবের মধ্যে ১২টি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা শুরু, কর প্রশাসন, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘদিনের বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা কমবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ ভবনে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সামনে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত বিনিয়োগ-সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে বিডা।
ব্রিফিংয়ে সভাপতিত্ব করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। স্বাগত বক্তব্য দেন বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি।
বিডা ও এনবিআরের কর্মকর্তারা যৌথ উপস্থাপনায় জানান, বাজেটের আগে বিডা, এনবিআর এবং অন্যান্য বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার অংশগ্রহণে চার দফা আন্তঃসংস্থার বৈঠক এবং একাধিক কারিগরি পর্যালোচনার ভিত্তিতে সুপারিশগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলেই অধিকাংশ প্রস্তাব বাজেটে স্থান পেয়েছে।
ব্যবসা সহজ করার অংশ হিসেবে বাজেটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শিথিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে ব্যবসায়িক অনুমোদন ১৪ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের ব্যবস্থা, বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর করা এবং বন্ড সুবিধার আওতা সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) কাঠামোর আওতায় দ্রুত শুল্ক ছাড়ের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে এবং কাস্টমস ছাড়ের সময় বেসরকারি পরীক্ষাগারের পরীক্ষার প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে।
কর প্রশাসন ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ স্থানান্তর আরও সহজ করতে বাজেটে একাধিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মুনাফা ও নন-রেসিডেন্ট টাকার হিসাব (এনআইটিএ) থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই অর্থ প্রত্যাবাসনের সীমা বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক ইলেকট্রনিক ভ্যাট রিটার্ন, স্বয়ংক্রিয় বিআইএন নিবন্ধন ও ভ্যাট ফেরত এবং এক বছরের মধ্যে কর নিরীক্ষা শেষ করার বিধান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কর নির্ধারণের বিরুদ্ধে আপিল করতে প্রয়োজনীয় অগ্রিম জমার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্যও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুল্কমুক্ত আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেল, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্য, হস্তশিল্প এবং পুনর্ব্যবহৃত বস্ত্রপণ্যসহ আরও ১০টি খাত ব্যাংক গ্যারান্টির ভিত্তিতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাবে।
বার্ষিক বাজেটের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত আয়করের হার ও স্তর ২০৩০–৩১ অর্থবছর পর্যন্ত আগাম নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ ও স্টার্টআপ খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর ও ভ্যাট সুবিধা রাখা হয়েছে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনে ধাপে ধাপে ১০ বছরের কর অবকাশও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং মূল্যবান ধাতু খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচিত যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো বা শূন্য করা, স্টার্টআপ অর্থায়নে সহায়তা, রপ্তানিমুখী উৎপাদনে উৎসাহ এবং অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোতে শতভাগ বিদেশি মালিকানার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এই বাজেট তিনটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। প্রথমত, সরকার নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাতগুলোকে লক্ষ্য করেই বাজেট কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তৃতীয়ত, লজিস্টিকস ও সরবরাহ শৃঙ্খল অবকাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে, তবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে সেগুলো মোকাবিলা করা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নীতিগত দিকনির্দেশনা এখন স্পষ্ট।
অনুষ্ঠানে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি ছাড়াও জেট্রো, কোট্রা, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি), ইউরোপীয় চেম্বার (ইউরোচ্যাম), আমেরিকান চেম্বার (অ্যামচ্যাম), চায়না এন্টারপ্রাইজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ, ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ, বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বিডা জানিয়েছে, বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া বাকি প্রস্তাবগুলো নিয়েও এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ঘোষিত সংস্কারগুলো মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে বিডা, এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় জোরদার করা হবে।













