নগদ টাকার বিকল্প হিসেবে দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেন দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে এসব কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ৯১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘দেশের ভেতরে ও বাইরে কার্ড ব্যবহারের ধরণ: একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের বিগ ডাটা অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড ডাটা সায়েন্স ইউনিট জুন ২০২৬-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কার্ড ইস্যু, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং কার্ড ব্যবহারের পরিবর্তনশীল প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই ২০২১-এ দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ছিল যথাক্রমে ২ কোটি ৩৬ লাখ, ১৭ লাখ ৩৮ হাজার এবং ৯ লাখ ৫৫ হাজারের মতো। জুন ২০২৬-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৪ কোটি ৩ লাখ, ২৭ লাখ ৫১ হাজার এবং ৮৬ লাখ ৯৭ হাজারে। তিন ধরনের কার্ড মিলিয়ে পাঁচ বছরে মোট সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশ।
কার্ডের ব্যবহারও একই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাই ২০২১-এ তিন ধরনের কার্ডে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৭১ মিলিয়ন টাকা। জুন ২০২৬-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার ১২৮ মিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯১ শতাংশ।
কার্ডের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে প্রিপেইডে। ডিসেম্বর ২০২২ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা যথাক্রমে ৩৫ ও ৩০ শতাংশ বাড়লেও প্রিপেইড কার্ড বেড়েছে ১৫৭ শতাংশ।
জুনে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৪৪ হাজার ৬১০ মিলিয়ন টাকা, যা মে মাসের ৪২ হাজার ৮৭৯ মিলিয়ন টাকার তুলনায় ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ বেশি। অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৫০ দশমিক ৯৫ শতাংশই হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এরপর রিটেইল আউটলেট, ইউটিলিটি বিল, নগদ উত্তোলন, সরকারি সেবা এবং ওষুধ ও ফার্মেসি খাত রয়েছে।
মোট অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৯১ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে কেনাকাটায়। নগদ উত্তোলনে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ এবং ফান্ড ট্রান্সফারে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ লেনদেন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন অফার এবং সহজে কেনাকাটার সুযোগ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা বাড়িয়েছে।
দেশের বাইরে কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও জুনে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাংলাদেশি কার্ডধারীরা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডে বিদেশে মোট ১০ হাজার ৩৭০ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। মে মাসে এই ব্যয় ছিল ৮ হাজার ১২৯ মিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বিদেশে কার্ড ব্যয় বেড়েছে ২৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ৫২৭ মিলিয়ন টাকা। দেশভিত্তিক ব্যবহারে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র—মোট লেনদেনের ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। এরপর থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও ভারত।
বিদেশে ডেবিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ২৩২ মিলিয়ন টাকা বা ৪২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে সরকারি সেবা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও ব্যবসায়িক সেবায়। প্রিপেইড কার্ডে বিদেশে লেনদেন হয়েছে আরও ৬১১ মিলিয়ন টাকা।
অন্যদিকে, বিদেশি কার্ডধারীরা জুনে বাংলাদেশে ২ হাজার ৪১৫ মিলিয়ন টাকা বা ২৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। মে মাসে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১২৪ মিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বিদেশি কার্ডের মাধ্যমে দেশে লেনদেন কমেছে ২২ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
বাংলাদেশি কার্ডধারীদের বিদেশে ব্যয় ও বিদেশি কার্ডধারীদের বাংলাদেশে ব্যয়ের তুলনায়ও বড় ব্যবধান রয়েছে। জুনে বাংলাদেশ থেকে কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ বহির্গমন হয়েছে ১০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন টাকা, বিপরীতে বিদেশি কার্ডের মাধ্যমে দেশে এসেছে ২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ বহির্গমনের পরিমাণ ছিল আগমনের প্রায় ৪ দশমিক ২৯ গুণ।
জুন শেষে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া স্থিতি ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা।
তবে কার্ড ব্যবহারের বিস্তারের পাশাপাশি নগদনির্ভরতা কমানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, কম আর্থিক সাক্ষরতা, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং ডিজিটাল পেমেন্টে আস্থার ঘাটতি বাধা হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে জালিয়াতি প্রতিরোধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহক সচেতনতা আরও জোরদার করা জরুরি।













