বাংলাদেশের সরকারি অর্থবছরের সময়কাল বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে এপ্রিল-মার্চ সময়কাল চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরিবর্তনের আগে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে নয় মাসের একটি অন্তর্বর্তী অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করা হবে—যা চলবে জুলাই ২০২৭ থেকে মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত। এরপর ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে নতুন এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর কার্যকর হবে।
সোমবার (১৭ জুলাই) মন্ত্রিসভার ১৭তম বৈঠকে অর্থবিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি, জুলাই-জুন অর্থবছরের কারণে অর্থবছরের শেষের গুরুত্বপূর্ণ সময় জুলাই-আগস্টে পড়ে, যখন দেশে বর্ষা থাকে। এতে অবকাঠামো উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হয়, কাজের মেয়াদ বাড়ে, গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং জনদুর্ভোগ বাড়ে। এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে বর্ষা শুরুর আগেই বছরের বড় অংশের অবকাঠামোগত কাজ শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩০ জুন। নতুন কাঠামোয় সেটি বদলে শুরু হবে ১ এপ্রিল এবং শেষ হবে পরবর্তী বছরের ৩১ মার্চ। তবে এই পরিবর্তন এক ধাপে হচ্ছে না। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে নয় মাসে সীমিত করে জুলাই ২০২৭ থেকে মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত পরিচালনা করা হবে। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে ১ এপ্রিল-৩১ মার্চ নতুন সময়সূচি অনুযায়ী সরকারের সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের ফলে শুধু বাজেট উপস্থাপনের সময়সূচিই বদলাবে না; সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সিস্টেমেও পরিবর্তন আনতে হবে। এ জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, লেজিসলেটিভ বিভাগ, অর্থবিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে।
আইনগতভাবেও পরিবর্তনটি বাস্তবায়নে প্রস্তুতি নিতে হবে। মন্ত্রিসভার প্রেস ব্রিফে বলা হয়েছে, অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এবং জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। পাশাপাশি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের মূল যুক্তি বাংলাদেশের জলবায়ু ও উন্নয়নকাজের বাস্তবতার সঙ্গে অর্থবছরের সময়সূচির সমন্বয় ঘটানো। বর্তমানে জুনে অর্থবছর শেষ হওয়ার পর জুলাই-আগস্টে বর্ষাকাল চলতে থাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছর শেষ করার চাপ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে একটি সময়গত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। মন্ত্রিসভার নথিতে বলা হয়েছে, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর হলে বর্ষার আগেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হবে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পরিবর্তনের মধ্যবর্তী নয় মাসের অর্থবছরটি পরিচালনা করা। কারণ বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, হিসাব সংরক্ষণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সূচককে একটি ছোট সময়সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। এ পরিবর্তনের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো কীভাবে সাজানো হবে, তা সংশ্লিষ্ট কমিটির পরবর্তী কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। প্রেস ব্রিফে এ বিষয়ে বিস্তারিত বাস্তবায়ন কাঠামো দেওয়া হয়নি।
অর্থবছরের সময় পরিবর্তন বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তন। এর প্রভাব পড়বে সরকারের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, রাজস্ব সংগ্রহ, উন্নয়ন ব্যয়, সরকারি হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায়। তবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে পরিবর্তনের লক্ষ্য হিসেবে মূলত বর্ষার আগে অবকাঠামো উন্নয়নকাজ শেষ করার সুবিধাটিকেই সামনে আনা হয়েছে।
ফলে এখন মূল কাজ হবে সিদ্ধান্তটিকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তর সম্পন্ন করা। ২০২৭-২৮ সালের নয় মাসের অন্তর্বর্তী অর্থবছর হবে সেই পরিবর্তনের প্রস্তুতিপর্ব। আর ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ প্রবেশ করবে নতুন এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর ব্যবস্থায়।













