ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাকের বাজারে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে আরও বেশি—১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
অর্থাৎ শুধু ইউরোপের বাজার সংকুচিত হওয়াই নয়, বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে পণ্য সরবরাহের পরিমাণ এবং গড় মূল্য—দুই দিকের পতনই কাজ করেছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৫ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ইউরো। এক বছরে আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ইউরো বা ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
শুধু আমদানির অর্থমূল্য নয়, পরিমাণও কমেছে। ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানির পরিমাণ ২ দশমিক ২২ বিলিয়ন কেজি থেকে কমে ২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন কেজিতে নেমেছে, অর্থাৎ ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে গড় ইউনিট মূল্য ২০ দশমিক ৪৭ ইউরো থেকে কমে ১৯ দশমিক ৭৫ ইউরো হয়েছে, যা ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ কম।
এই সংকুচিত বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরোর তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ ছয় মাসে বাংলাদেশ প্রায় ১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ইউরোর বাজার হারিয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে পণ্যের পরিমাণ ও দাম—দুটিই ভূমিকা রেখেছে। ছয় মাসে বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ ৬৭৮ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন কেজি থেকে কমে ৬২২ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন কেজিতে নেমেছে। এতে পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১৫ দশমিক ২৪ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ ইউনিট মূল্য কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
তবে জুন মাসের পরিসংখ্যানে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ওই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি হলেও চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে মূলত রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে। জুনে বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহ ৯৫ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন কেজি থেকে বেড়ে ১০১ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন কেজি হয়েছে, অর্থাৎ ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিন্তু বাড়তি পরিমাণের বিপরীতে দাম কমেছে। জুনে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১৪ দশমিক ২২ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৪৬ ইউরো হয়েছে, যা ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ কম। ফলে বেশি পণ্য রপ্তানি করেও মূল্য কমে যাওয়ার কারণে মোট রপ্তানি আয় খুব সামান্য বেড়েছে।
এতে বাংলাদেশের জন্য ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। শুধু বেশি পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করলেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাচ্ছে না; পণ্যের মূল্য বা মূল্য সংযোজনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের পোশাক রপ্তানিও ছয় মাসে ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমেছে। তুরস্কের কমেছে ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, ভারতের ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ২১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো অধিকাংশ প্রধান সরবরাহকারীই একই সময়ে ইউরোপীয় বাজারের সংকোচনের চাপের মুখে পড়েছে।
তবে ব্যতিক্রম ভিয়েতনাম। ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেশটির পোশাক রপ্তানি শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ কমলেও গড় মূল্য বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে কম পরিমাণে পণ্য পাঠিয়েও বেশি দামের কারণে দেশটি মোট রপ্তানি আয় ধরে রাখতে পেরেছে।
এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিমাণ যেমন কমেছে, তেমনি গড় মূল্যও প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উচ্চমূল্যের পোশাকে প্রবেশের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও জুনে পোশাকের গড় মূল্য বাড়িয়েছে। কিন্তু ছয় মাসের হিসাবে তাদের রপ্তানি পরিমাণের পতন এতটাই বেশি ছিল যে উচ্চমূল্য সত্ত্বেও মোট রপ্তানি আয় বাড়াতে পারেনি। অন্যদিকে পাকিস্তান ছয় মাসে সরবরাহের পরিমাণ ৪ দশমিক ০২ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হলেও মোট রপ্তানি মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ—যা মূল্যের পতনের প্রভাবকে স্পষ্ট করে।
সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানির এই পরিসংখ্যান বলছে, বাজার সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলাচ্ছে। চাহিদা কমার সময়ে কম দামে বেশি পণ্য বিক্রির কৌশল দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে কম পরিমাণের বিপরীতে বেশি মূল্য আদায়ের সক্ষমতা সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশের পোশাক রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাজার। প্রথম ছয় মাসে বিশ্ব থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে শুধু বৈশ্বিক বাজার সংকোচন দিয়ে বাংলাদেশের পতনকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না; বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ এবং গড় মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে জুনের শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিছুটা আশার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। মাসটিতে রপ্তানির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। এখন এই বাড়তি বাজারকে টেকসই করতে হলে কম দামের ওপর নির্ভর না করে পণ্যের মান, নকশা, বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করাই বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।













