ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ নামতেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। দীর্ঘ অচলাবস্থা শেষে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা এবং ইরান-মার্কিন সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবরে এক দিনেই তেলের দাম কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। শুক্রবার বাজার খোলার পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই—উভয় তেলের দামেই এই ঐতিহাসিক পতন লক্ষ্য করা গেছে, যা গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণার পরপরই তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতন শুরু হয়। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১২.৮৭ ডলার বা ১২.৯৫ শতাংশ কমে ৮৬.৫২ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১৩.৫০ ডলার বা ১৪.২৬ শতাংশ কমে ৮১.১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ১০ মার্চের পর তেলের এটিই সর্বনিম্ন দর এবং ৮ এপ্রিলের পর এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ দরপতনের রেকর্ড।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বার্তায় জানিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে ইরানের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ইরান আর কখনোই এই প্রণালি বন্ধ না করার বিষয়ে একমত হয়েছে। ট্রাম্পের মতে, তেহরানের সাথে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ওয়াশিংটন এখন অনেক বেশি আশাবাদী।
যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এই সপ্তাহেই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছিল। তবে আজকের এই নাটকীয় পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। ডাও জোন্স সূচক ৭৪৫ পয়েন্ট বা ১.৫৪ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং নাসডাক সূচক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ৩০ মার্চের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বর্তমানে ১১ শতাংশের বেশি এগিয়ে আছে।
ইরান প্রণালি খুলে দিলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ এখনই প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে চলমান শান্তি আলোচনার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল না আসা পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনার এই অবরোধ বলবৎ থাকবে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তির শতভাগ কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা কোনো প্রকার অপমানজনক শর্তে চুক্তিতে সই করবে না। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখা এবং উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো কিছু মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ইউবিএস বিশ্লেষক জিওভানি স্টাউনোভো মনে করেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যতক্ষণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে ততক্ষণ তেলের বাজারে উত্তেজনা কম থাকবে। তবে সেব রিসার্চের বিশ্লেষক ওলে হুভালবি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর থেকে ইউরোপের রটারডাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজ পৌঁছাতে প্রায় ২১ দিন সময় লাগে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে। এছাড়া পারমাণবিক ইস্যু বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে ইসলামাবাদে হতে যাওয়া আলোচনায় কোনো অচলাবস্থা তৈরি হলে ইরান আবারও এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বাজার বিশেষজ্ঞরা।













