ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা যখন ক্রমেই ভারী হচ্ছে, ঠিক তখনই সেই ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। খেলাপি ঋণ বাড়লেও এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের অনুপাত কমে গেছে। অর্থাৎ ব্যাংকের সম্পদের মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য লোকসান শোষণের বাফারও সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিস্টেমিক রিস্ক রিপোর্টে এ পরিস্থিতিকে ব্যাংকিং খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্টেবিলিটি ডিপার্টমেন্টের ডিসেম্বর ২০২৫-এর ‘বাংলাদেশ সিস্টেমিক রিস্ক রিপোর্টে’ ব্যাংকিং খাতের সম্পদের মান, মূলধন, তারল্য, মুনাফা, সুদের হার ও বাজার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সের কিছু সূচকে দুর্বলতা এসেছে। ফলে ব্যাংক খাতের ঝুঁকির সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির চাপও যুক্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন ২০২৫-এর তুলনায় ডিসেম্বর ২০২৫-এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর হয়েছে। একই সময়ে জিডিপির তুলনায় বাণিজ্য ভারসাম্য ও রেমিট্যান্সের অনুপাতও কমেছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কিছুটা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক খাতের কয়েকটি সূচকেও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
সরকারের আর্থিক অবস্থায়ও পাওয়া গেছে মিশ্র চিত্র। আগের অর্থবছরের তুলনায় জিডিপির অনুপাতে সরকারের ঘাটতি সামান্য কমলেও সরকারি ঋণের অনুপাত বেড়েছে। রাজস্ব আয়ের তুলনায় সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় রাজস্বের সাপেক্ষে ঋণের অনুপাতও উঁচু রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে সরকারি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি সম্পদের মান। খেলাপি ঋণ বাড়ার বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের অনুপাত কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ থেকে সৃষ্ট ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রভিশন না থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
মূলধন পরিস্থিতিতেও স্বস্তির পুরো চিত্র নেই। ডিসেম্বর ২০২৫-এ ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় অধীনস্থ ঋণের অনুপাত মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিআরএআরকে দুর্বল অবস্থানে দেখানো হয়েছে। এ বিশ্লেষণে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংক বাদ দিয়ে ৫৬টি ব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
তারল্য ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া গেছে। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের অংশ জুনের তুলনায় সামান্য বেড়েছে। একই সময়ে ১৮২ দিনের ট্রেজারি বিলের পরিমাণে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিপরীতে ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অর্থবাজারে মুদ্রানীতির প্রভাবও স্পষ্ট হয়েছে। জুন ২০২২ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কলমানির সুদের হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো হারের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ প্রবণতা কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাব অর্থবাজারে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।
তবে ডিসেম্বর ২০২৫-এ ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের ভারিত গড় সুদের হার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। ২০২৪ সালে সুদের ব্যবধান বা স্প্রেড বাড়ার পর পরবর্তী সময়ে তা স্থিতিশীল পর্যায়ে এসেছে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্বস্তির চিত্রও উঠে এসেছে। প্রধান বৈদেশিক মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডিসেম্বর ২০২৫-এ টাকার মান সামান্য শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে জুন ২০২৫-এ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে বিনিময় হারের প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে অবশ্য পরিস্থিতি ছিল মিশ্র। ডিসেম্বর ২০২৫-এ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সামান্য বেড়েছে। ডিএস৩০ সূচকও প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। তবে শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং ডিসেম্বর ২০২৩-এর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
ব্যাংকের মুনাফা ও দক্ষতার সূচকেও ওঠানামা রয়েছে। ৫৬টি ব্যাংকের রিটার্ন অন ইকুইটি বা আরওই এবং রিটার্ন অন অ্যাসেট বা আরওএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখেছে, দুই সূচকেই প্রায় একই ধরনের ষাণ্মাসিক ওঠানামা রয়েছে। সাধারণত ডিসেম্বর শেষে সূচক দুটি বাড়ে এবং পরবর্তী জুনে কমে।
পরিচালন দক্ষতার ক্ষেত্রেও কিছুটা চাপের ইঙ্গিত মিলেছে। জুন ২০২৫ শেষে পরিচালন আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত ডিসেম্বর ২০২৪-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। পরে ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে সুদের আয় কমে যাওয়ায় মোট পরিচালন আয়ের তুলনায় নিট সুদ আয়ের অনুপাতও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিচালন ব্যয় ও পরিচালন আয়ের অনুপাত ১০০ শতাংশের বেশি হলে ঋণ-ক্ষতি প্রভিশন বিবেচনার আগেই ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় তার পরিচালন আয়কে ছাড়িয়ে যায়। ফলে এ অনুপাত ব্যাংকের মূল পরিচালন সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
অন্যদিকে, মোট পরিচালন আয়ের তুলনায় নিট সুদ আয়ের অনুপাত ব্যাংকের মূল ব্যবসা—ঋণ থেকে সুদ আয় এবং আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয়ের ব্যবধান—মোট আয়ে কতটা অবদান রাখছে, তার একটি ধারণা দেয়। এ সূচকের পতন ব্যাংকের মূল সুদভিত্তিক ব্যবসা থেকে আয়ের অবদান কমার ইঙ্গিত বহন করে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতে একদিকে খেলাপি ঋণ ও সম্পদের মান নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে মূলধন ও প্রভিশন সংরক্ষণে চাপের চিত্র উঠে এসেছে। এর সঙ্গে কঠোর মুদ্রানীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা এবং সরকারি ঋণের চাপ যুক্ত হওয়ায় ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে, ‘বাংলাদেশ সিস্টেমিক রিস্ক রিপোর্ট’ কোনো আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নয়। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সূচকগুলোকে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির নিশ্চিত পূর্বাভাস বা নির্ধারক প্রাক্কলন হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন ঝুঁকি ও প্রবণতা তুলে ধরাই এ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য।













