ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বাড়ছে, কিন্তু ফেরত আসছে কম

Bangladesh Bank
ডিএসজে

দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে একই সময়ে ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় খাতটির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা ও উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ঋণ বিতরণ বাড়লেই হবে না, সেই ঋণ সময়মতো আদায় না হলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সিএমএসএমই খাতে মোট ৭০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এক বছর আগে একই সময়ে বিতরণ হয়েছিল ৬২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ।

শুধু আগের বছরের তুলনায় নয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায়ও ঋণ বিতরণে বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিতরণ হয়েছিল ৪৮ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রথম প্রান্তিকের ধীরগতির পর ঋণ বিতরণে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলেছে।

তবে ঋণ বিতরণের এই ইতিবাচক প্রবণতার বিপরীতে আদায়ের চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সিএমএসএমই খাত থেকে ব্যাংকগুলো আদায় করেছে ৫৫ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৫৭ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বাড়লেও আদায় কমেছে ১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও ঋণ আদায়ে বড় ধরনের পতন দেখা গিয়েছিল। ওই সময়ে আদায় আগের বছরের তুলনায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৩৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। ফলে টানা দুই প্রান্তিকে আদায়ের দুর্বলতা ছোট উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থপ্রবাহ ও ব্যবসায়িক সক্ষমতার ওপর চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, সিএমএসএমই অর্থায়নের মূল ভার এখনো বহন করছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট বিতরণকৃত ঋণের ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে এই ব্যাংকগুলো। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক বিতরণ করেছে ৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, বিশেষায়িত ব্যাংক ২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা, বিদেশি ব্যাংক ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ২ হাজার ৮৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সিএমএসএমই খাতে মোট স্থিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। দেশের মোট ১৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা স্থিত ঋণের মধ্যে সিএমএসএমই খাতের অংশ এখন ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ বিতরণ বাড়ার অর্থ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফিরছে। কিন্তু একই সময়ে ঋণ আদায় কমে যাওয়ার অর্থ হলো অনেক উদ্যোক্তা বিক্রি বাড়াতে পারছেন না কিংবা পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ তৈরি করতে পারছেন না। উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল ভোক্তা চাহিদা এবং বাজারের অনিশ্চয়তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে আদায় দুর্বল থাকলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও প্রভাবিত হবে। বিশেষ করে সিএমএসএমই খাত কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ায় এ খাতে অর্থপ্রবাহ সচল রাখা এবং একই সঙ্গে কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিএমএসএমই খাতে মোট ঋণ বিতরণ কমে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছিল, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। সেই ধীরগতির পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও আদায়ের দুর্বলতা পুরো চিত্রকে মিশ্র করে তুলেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সিএমএসএমই খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। সহজ শর্তে অর্থায়ন, উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদারের পাশাপাশি ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় ঋণ বিতরণের এই প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top