এস আলম গ্রুপের নজিরবিহীন লুটে দেউলিয়া প্রায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি নিজের হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ ও পলাতক পি কে হালদারের সম্মিলিত লুটপাটে খাদের কিনারে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কোনোমতে সচল রাখতে এবং আমানতকারীদের অর্থ রক্ষায় সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জরুরি নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন এখন থেকে প্রশাসক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগে কর্মরত পরিচালক হাসান তারেক খাঁনকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সুবিধার্থে তিনি আগামী ২৭ এপ্রিল কর্মদিবস শেষে তার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি পাবেন বলে গণ্য হবে। মূলত প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের শূন্যতা এবং আর্থিক বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছানোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কঠোর হস্তক্ষেপের পথ বেছে নিয়েছে।
আভিভা ফাইন্যান্সের বর্তমান এই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে এর পূর্ববর্তী নাম ‘রিলায়েন্স ফাইন্যান্স’ থাকাকালীন ভয়াবহ অর্থ আত্মসাতের ইতিহাস। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন এমডি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার ও তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের সরাসরি ছত্রছায়ায় প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা বেনামি ঋণের নামে লুট করা হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নামসর্বস্ব অন্তত ৩০টি ভুয়া কোম্পানি খুলে কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই এই বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়।
পেশাদারত্বের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে চালানো সেই মেগা জালিয়াতির ফলে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ বর্তমানে ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। পি কে হালদার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ধামাচাপা দিতে এবং ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টায় নাম পরিবর্তন করে ‘আভিভা ফাইন্যান্স’ রাখা হয়েছিল। তবে মালিকানায় এস আলম গ্রুপের একক নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকায় এবং অলিগার্কদের চাপে ঋণের টাকা আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আভিভা ফাইন্যান্সের বোর্ড প্রথম দফায় পুনর্গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ মো. সদরুল হুদাকে চেয়ারম্যান করে ৫ সদস্যের একটি শক্তিশালী বোর্ড গঠন করা হলেও এস আলমের রেখে যাওয়া আর্থিক ক্ষত এতটাই গভীর ছিল যে, দক্ষ ব্যক্তিদের দিয়েও নিয়মিত কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে না পারা এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে শেষ পর্যন্ত বোর্ড সরিয়ে প্রশাসক বসাতে বাধ্য হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আগের বোর্ডে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান এইচ এম মোশারফ হোসেন, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি মো. রফিকুল ইসলাম ও আইসিবির সাবেক ডিএমডি আবু তাহের মোহাম্মদ আহমেদুর রহমান। এখন থেকে হাসান তারেক খাঁন প্রশাসক হিসেবে সরাসরি প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কাজ তদারকি করবেন এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের শেষ চেষ্টা চালাবেন। রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সময়কার সেই লুটপাটের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন সাধারণ আমানতকারীরা, যারা বছরের পর বছর নিজেদের জমানো টাকা ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।













