রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অনেকটা দুর্বল করে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫-এ বলা হয়েছে, দেশে পণ্য ও সেবার চাহিদা কমার পাশাপাশি কঠোর রাজস্ব ও মুদ্রানীতির প্রভাব অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে নেপালের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিকেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জিং হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণেই এই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। তবে জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমায় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে পুনরায় গতি আসবে বলেও এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এডিবি জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, তদারকির অভাব এবং মূলধনের ঘাটতি এই খাতের দক্ষতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে এডিবি বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলারের নীতি সহায়তা দিয়েছে, যা মূলত ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা ফেরাতে ব্যবহৃত হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এডিবি বাংলাদেশকে সব মিলিয়ে ৫২১ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি ঋণ ও অনুদান হিসেবে থাকছে ২৫৭ কোটি ডলার। বাকি অর্থ বেসরকারি খাত এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সঙ্গে সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে প্রদান করা হবে, যা দেশের অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় হবে।
পরিবহন খাতের দুর্বলতাকে ব্যবসার খরচ বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এডিবি। এটি দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে এই খাতের উন্নয়নে চট্টগ্রাম ও দোহাজারীর মধ্যে রেললাইন আধুনিকায়নে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি, যা আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এডিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, দ্রুত উন্নয়নের ফলে দেশে জ্বালানির চাহিদা বাড়লেও এখন কম কার্বন নিঃসরণকারী সমাধানের দিকে এগোতে হবে। তবে এজন্য শক্তিশালী নীতিগত সমর্থন, বড় বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহারের ধরনে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তৈরি পোশাক খাতকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বর্ণনা করে এডিবি বলেছে, বিশ্ববাজারে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের কারখানাগুলো আধুনিকায়নের চাপে রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ কমাতে এডিবি তাদের সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০২৫ সালে এডিবি বিশ্বব্যাপী ২৯.৩ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বিনিয়োগ করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা জানিয়েছেন, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ এই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।













