সেতুর বড় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর মেরামত নয়। এবার ত্রুটি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করতে চায় সরকার। এজন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোতে বসানো হবে স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে সেতুর ‘স্বাস্থ্য’ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ উদ্যোগে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের বড় অংশই যাচ্ছে পরামর্শক ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতাধীন সেতুগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে নেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনস্থ সেতুসমূহের স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তির সক্ষমতা উন্নয়ন’ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আজ বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের এটি দ্বিতীয় একনেক সভা। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুমোদন পেলে চলতি বছরই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা) অনুদান হিসেবে দেবে ১০৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সেতুর অবকাঠামোগত অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাই এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য সেতুর কম্পন, কাঠামোগত চাপসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক ডিজিটাল পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এতে বড় ধরনের ত্রুটি বা ঝুঁকির লক্ষণ আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে এই প্রযুক্তি বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো হলো মধুমতী বা কালনা সেতু, কামারখালী সেতু এবং ডেমরা সেতু। এসব সেতুতে স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে কাঠামোগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এর পাশাপাশি কামারখালী, ডেমরা ও তরা সেতুর বিস্তারিত পরিদর্শন করা হবে। এসব পরিদর্শনের ভিত্তিতে আধুনিক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নকশাও তৈরি করা হবে। সারাদেশের সেতুগুলোর তথ্য এক জায়গা থেকে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য সওজের সদর দপ্তরে একটি ‘সমন্বিত ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে।
তবে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো নিয়ে প্রশ্নের জায়গাও রয়েছে। মোট ১১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার মধ্যে শুধু পরামর্শক খাতেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫ কোটি ১৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি অর্থই যাচ্ছে পরামর্শকের পেছনে।
শুধু তাই নয়, সওজের কর্মকর্তাদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প প্রস্তাবে কতজন কর্মকর্তা এই প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন, কোন কোন দেশে প্রশিক্ষণ হবে এবং প্রশিক্ষণের মেয়াদ কত—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ নেই।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেতুর ত্রুটি বড় আকার নেওয়ার আগেই শনাক্ত করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সেতুর আয়ুষ্কাল বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে মেরামত ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ সেতু ব্যবস্থাপনায় প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণাবেক্ষণের বদলে আগাম সতর্কতাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকেও (বিবিএ) সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে সওজের আওতাধীন সেতু ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে আজকের একনেক সভায় সওজের এই প্রকল্প ছাড়াও আরও ১০টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৪৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। প্রকল্পগুলোর মধ্যে সাতটি নতুন এবং চারটি সংশোধিত—এ হিসাবে সংশোধিত প্রকল্পসহ মোট সংখ্যা ১১টি।
এর বাইরে পরিকল্পনামন্ত্রী ইতিমধ্যে অনুমোদন করেছেন এমন ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও নয়টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেক সভায় সদস্যদের অবহিত করা হবে।
সব মিলিয়ে এবারের একনেকের প্রকল্প তালিকায় বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সেতুর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব বাড়ানোর যুক্তির পাশাপাশি ১১৬ কোটি টাকার প্রকল্পে পরামর্শক ও বিদেশি প্রশিক্ষণে বড় অঙ্কের ব্যয় কতটা কার্যকর হবে, সেটিও বাস্তবায়ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।













