সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধা নিয়ে মাঠপর্যায়ে তৈরি হওয়া জটিলতা কাটাতে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সোলার প্যানেল ও সোলার ইনভার্টারের এইচএস কোড নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও পণ্যের প্রকৃত বর্ণনা ও ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট শুল্ক-সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্ল্যান্ট স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক-কর কাঠামোও স্পষ্ট করা হয়েছে।
আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) এনবিআরের কাস্টমস নীতি ও আইসিটি বিভাগের প্রথম সচিব মো. তারেক হাসান স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন কাস্টমস হাউস ও এলসি স্টেশনে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা নিরসনেই নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের পরিপত্র অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহসংক্রান্ত বিদ্যমান প্রজ্ঞাপনে সোলার ফটোভোল্টাইক/মডিউল/প্যানেল (এইচএস কোড ৮৫৪১.৪৩.০০) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে পণ্যের এইচএস কোডে এ শ্রেণি বিদ্যমান থাকলেও কোনো আমদানিকারক বিল অব এন্ট্রিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট একাধিক পণ্য ঘোষণা করলে এবং প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য নির্ধারিত শুল্ক-কর সুবিধা দেওয়া যাবে।
অর্থাৎ শুধু পণ্যের এইচএস কোড নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে সৌর প্যানেল আমদানিতে প্রযোজ্য সুবিধা আটকে রাখা যাবে না। সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের শর্ত পূরণ করাই হবে সুবিধা পাওয়ার মূল ভিত্তি।
সোলার ইনভার্টারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এনবিআরের পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিদ্যমান প্রজ্ঞাপনের তফসিলের টেবিল-১-এ সোলার ইনভার্টারের বিপরীতে এইচএস কোড ৮৫০৪.৪০.৪০ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পণ্যের অনুধাবনযোগ্য বা প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাসে এইচএস কোড ৮৫০৪.৪০.৯০ উল্লেখ থাকলেও এ ক্ষেত্রে পণ্যের বর্ণনাই প্রাধান্য পাবে।
ফলে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় সোলার ইনভার্টার হিসেবে প্রতীয়মান হলে শুধু এইচএস কোডের পার্থক্যের কারণে শুল্ক-কর সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সৌর ইনভার্টার আমদানির ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত শুল্ক-কর রেয়াত সুবিধা প্রযোজ্য হবে বলে স্পষ্ট করেছে এনবিআর।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্ল্যান্ট স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও আমদানির শুল্ক কাঠামো নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করতে চাইলে প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান প্রজ্ঞাপন ও প্রজ্ঞাপন নীতিমালার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ৩ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি দিয়ে পণ্য খালাস করতে পারবে।
অন্যদিকে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য শুল্ক-কর কাঠামো আলাদা। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ আগাম কর এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিয়ে পণ্য খালাস করতে পারবেন। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তীতে আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর সমন্বয়যোগ্য হবে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতের জন্য এই নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত আমদানি পর্যায়ের জটিলতা কমানোর কারণে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে কাস্টমস পর্যায়ে পণ্য খালাস বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এনবিআর নিজেই পরিপত্রে স্বীকার করেছে, মাঠপর্যায়ে এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে এনবিআর মূলত দুটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—প্রথমত, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত সুবিধা বাস্তবায়নে পণ্যের প্রকৃত ব্যবহার ও বর্ণনাকে গুরুত্ব দিতে হবে; দ্বিতীয়ত, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকের জন্য প্রযোজ্য শুল্ক-কর কাঠামো আলাদাভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি প্রক্রিয়া কিছুটা সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের মতো মূল সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে এইচএস কোডসংক্রান্ত জটিলতা কমলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও আমদানি ব্যয়—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এনবিআরের এই পরিপত্র সরাসরি সব ধরনের সৌর সরঞ্জামকে শুল্কমুক্ত করেনি। বরং সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত পণ্য, নির্ধারিত শর্ত এবং আমদানিকারকের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য শুল্ক-কর সুবিধা গ্রহণের পথ স্পষ্ট করেছে। ফলে কোনো পণ্যকে শুধু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে—এই দাবির ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি; প্রজ্ঞাপনের শর্ত পূরণ করতে হবে।
পরিপত্রটি কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে। এতে দেশের সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউস, কাস্টমস স্টেশন, কমিশনারেট এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রেক্ষাপটে আমদানি পর্যায়ে এ ধরনের শুল্ক-কর সুবিধা ও তার বাস্তব প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকল্পের মূলধনী ব্যয়ের বড় একটি অংশ সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমদানির সঙ্গে যুক্ত। এসব পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস ও শুল্ক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে তা প্রকল্পের সময় ও ব্যয়—দুইয়ের ওপরই চাপ তৈরি করতে পারে।
এনবিআরের নতুন নির্দেশনার ফলে অন্তত সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক-কর সুবিধা প্রয়োগের বিষয়ে কাস্টমস পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। এখন এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কতটা দ্রুত ও অভিন্নভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই হবে সৌরবিদ্যুৎ খাতের আমদানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।













