সুকুকের প্রাথমিক বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দখল আরও শক্ত হলো। নতুন বণ্টন কাঠামোয় মোট ইস্যুর ৮০ শতাংশই বরাদ্দ রাখা হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, বীমা কোম্পানি এবং প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোর জন্য। বিপরীতে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা পাবেন সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। ফলে সুকুক বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত রেখেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) জারি করা ডিএমডি সার্কুলার লেটারে সুকুক ইস্যুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন এই বরাদ্দ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে জারি করা ডিএমডি সার্কুলার লেটার নম্বর-১৩ বাতিল করা হয়েছে এবং নতুন নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, মোট ইস্যুকৃত সুকুকের ৫০ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি ও বীমা কোম্পানির জন্য। আরও ৩০ শতাংশ রাখা হয়েছে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোর জন্য। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাকি ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন বণ্টন অনুযায়ী, সুকুকের প্রতি ১০০ টাকার ইস্যুতে ৮০ টাকা সরাসরি শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত থাকবে। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য থাকবে ১০ টাকা এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও ১০ টাকা।
অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শ্রেণিতে প্রচলিত ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, বীমা কোম্পানি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স, ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত চাহিদায় আনুপাতিক বরাদ্দ
সুকুকের কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিতে নির্ধারিত কোটার চেয়ে বেশি আবেদন বা বিড জমা পড়লে অতিরিক্ত চাহিদার ক্ষেত্রে আনুপাতিক ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত শ্রেণির সব আবেদনকারীর মধ্যে তাঁদের দাখিল করা বিডের অনুপাতে সুকুক ভাগ হবে।
ফলে কোনো একটি শ্রেণিতে চাহিদা নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি হলেও সেই শ্রেণির জন্য নির্ধারিত কোটা অতিক্রম করে বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একই শ্রেণির আবেদনকারীদের মধ্যে তাঁদের বিডের অনুপাতই বরাদ্দের ভিত্তি হবে।
অন্যদিকে কোনো শ্রেণিতে নির্ধারিত কোটার তুলনায় কম আবেদন বা বিড জমা পড়লে অব্যবহৃত অংশ অন্য শ্রেণির যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্যে বিতরণ করা যাবে। অর্থাৎ কোনো শ্রেণির নির্ধারিত অংশ পুরোপুরি ব্যবহার না হলে সেটি অব্যবহৃত অবস্থায় রাখার পরিবর্তে অন্য যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
আবার সব শ্রেণি মিলিয়ে মোট বিডের পরিমাণ ইস্যু করা সুকুকের পরিমাণের চেয়ে কম হলে অবশিষ্ট সুকুক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর অংশ ১০ শতাংশ
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য মাত্র ১০ শতাংশ বরাদ্দ। এর বিপরীতে আর্থিক খাতের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত হয়েছে মোট ৮০ শতাংশ।
এর ফলে সুকুকের প্রাথমিক বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য আরও স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৫০ শতাংশ এবং প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোর জন্য ৩০ শতাংশ বরাদ্দ থাকায় সুকুকের বড় অংশের চাহিদা এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের অংশ ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকায় সুকুকের খুচরা বিনিয়োগের পরিসর একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকবে। তবে নির্ধারিত কোটার মধ্যে চাহিদা বেশি হলে আনুপাতিক বরাদ্দের কারণে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর প্রকৃত বরাদ্দ আরও কমে যেতে পারে।
বদলে গেল আগের কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় আগের বণ্টন কাঠামো বাতিল করে নতুন অনুপাত কার্যকর করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট জারি করা ডিএমডি সার্কুলার লেটার নম্বর-১৩ নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে সুকুক ইস্যুর সময় কোন শ্রেণির বিনিয়োগকারী কতটা অংশ নিতে পারবেন, তা আগের তুলনায় আরও নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকবে। একই সঙ্গে কোনো শ্রেণিতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হলে কীভাবে বরাদ্দ হবে এবং কোনো শ্রেণির কোটা অব্যবহৃত থাকলে তার কী হবে—সেটিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে নতুন কাঠামো সুকুকের প্রাথমিক বাজারে শ্রেণিভিত্তিক বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট সীমা তৈরি করেছে। এতে একদিকে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বিনিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ নির্দিষ্ট কোটায় সীমাবদ্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে সুকুকের বরাদ্দ নির্ধারিত শ্রেণি, সংশ্লিষ্ট শ্রেণির চাহিদা এবং বিডের অনুপাতের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হবে। ফলে সুকুক ইস্যুর সময় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের কাঠামো আরও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় শ্রেণিভিত্তিক সীমাও স্পষ্ট থাকবে।













