মামলা আর প্রণোদনা একসঙ্গে নয়, নতুন শর্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের

Bangladesh Bank
ডিএসজে

ঋণ পুনর্গঠন, প্রণোদনা বা অন্য কোনো নীতিগত সহায়তা নিতে হলে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে—অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকদের জন্য এমন নতুন শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে মামলা চলমান রেখে একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্স কোম্পানি প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে দেশের সব অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছে। ‘নীতিগত সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রাহক কর্তৃক দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে’ শীর্ষক নির্দেশনাটি জারির সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার আওতায় কোনো গ্রাহক বা আবেদনকারীর দায়ের করা রিট পিটিশনসহ সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো মামলা অনিষ্পন্ন থাকলে তাঁর নীতিগত সহায়তা বা প্রণোদনা প্যাকেজের আবেদন এগিয়ে নেওয়া যাবে না। তবে মামলা প্রত্যাহারের শর্তে আবেদনটি প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করে নীতিগত সম্মতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা, আর্থিক খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো কোনো গ্রাহক একদিকে এসব সুবিধা নিচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিটসহ বিভিন্ন মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে আর্থিক খাতে মামলা জট তৈরি হচ্ছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি শুধু গ্রাহকের মৌখিক ঘোষণার ওপর নির্ভর করবে না। নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের আবেদন পর্যালোচনার পর সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান নীতিগত সম্মতি বা ‘ইন-প্রিন্সিপল স্যাংশন লেটার’ দিতে পারবে। এরপর গ্রাহককে মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করতে হবে।

মামলা প্রত্যাহারের পর গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তালিকাসহ একটি হলফনামাও দিতে হবে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের দায়ের করা কোনো মামলা আর অনিষ্পন্ন নেই।

হলফনামা পাওয়ার পর নীতিগত সহায়তা বা প্রণোদনার বাস্তবায়ন করতে হবে আগে দেওয়া শর্ত অনুযায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে বলেছে, মামলা প্রত্যাহারের কারণে গ্রাহকের জন্য দেওয়া নীতিগত সহায়তা বা প্রণোদনার শর্ত পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ মামলা প্রত্যাহারের পর নতুন করে সুবিধার শর্ত কঠোর বা পরিবর্তনের সুযোগ রাখেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নির্দেশনাটির ফলে আর্থিক খাতে সংকটে থাকা ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতিগত সহায়তা পাওয়ার সঙ্গে চলমান আইনি বিরোধের একটি সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হলো। একদিকে পুনর্গঠন ও প্রণোদনার মাধ্যমে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সুযোগ, অন্যদিকে সেই সুবিধা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে চলমান মামলা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা—দুই বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে আনল বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে এ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মামলা প্রত্যাহারের শর্তটি শুধু সরকারের বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে করা মামলার ক্ষেত্রেই নয়, সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের দায়ের করা মামলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে কোনো ঋণগ্রহীতা যদি অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে থাকেন, নীতিগত সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সেই মামলার অবস্থাও বিবেচনায় আসবে।

নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, কোনো গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে কি না, সে বিষয়টি এই শর্তের আওতায় কীভাবে বিবেচিত হবে—সেটিও আবেদন যাচাইয়ের অংশ হবে। তবে নির্দেশনার মূল শর্ত হলো, নীতিগত সহায়তা বা প্রণোদনা বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি হলফনামার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

অর্থায়ন খাতে চলমান পুনর্গঠন ও সংকট মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে নতুন নির্দেশনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আর্থিকভাবে দুর্বল ঋণগ্রহীতাদের পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দিচ্ছে। একই সময়ে এসব সুবিধা গ্রহণের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমার সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন নীতিগত সহায়তার একটি অতিরিক্ত প্রশাসনিক শর্তও নির্ধারণ করল।

তবে এই শর্তের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আইনি ও নীতিগত প্রশ্নও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো গ্রাহক যদি বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার বা অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের কোনো সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করে থাকেন, সেই মামলা প্রত্যাহারের বিনিময়ে নীতিগত সুবিধা দেওয়ার কাঠামো বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই, নীতিগত সম্মতি এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে নতুন শর্তটির কার্যকর রূপ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ৪১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছে। এতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্স কোম্পানি প্রবিধি ও নীতি বিভাগের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top