বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে জ্বালানি ব্যয় কমানোর বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারে। ৩৫০টি তৈরি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, কোনো কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় কমতে পারে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বড় বিনিয়োগ, সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নীতিগত বাধা দূর করার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ বাড়ায় সৌরবিদ্যুৎ এখন শুধু খরচ কমানোর বিষয় নয়; রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠছে।
সিপিডির সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পোশাক কারখানার গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় ৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৯০ টাকা। বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে এই ব্যয় নেমে আসতে পারে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩৫ টাকায়। অর্থাৎ মাসে গড়ে ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৫৫ টাকা এবং বছরে প্রায় ১৮ লাখ ২১ হাজার টাকা সাশ্রয় সম্ভব। একইভাবে বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে এলে গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে।
গবেষণায় এক হাজার সম্ভাব্য পরিস্থিতি ধরে করা বিশ্লেষণেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আরেকটি সুবিধা উঠে এসেছে। সিপিডির হিসাবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ৯৬ শতাংশ কারখানায় মাসিক জ্বালানি ব্যয়ের ওঠানামা কমতে পারে। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ শুধু গড় ব্যয় কমাবে না, জ্বালানি ব্যয়ের অনিশ্চয়তাও কিছুটা কমাতে পারে।
এই সম্ভাবনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে পোশাকশিল্পের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতার কারণে। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করছে। গ্যাস সংকট আরও তীব্র হলে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও পরিচালন ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করা টেকসই হবে না। তাঁর মতে, পোশাকশিল্পের বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের বাধাগুলো দূর করতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পোশাক কারখানার সব ধরনের জ্বালানি ব্যবহার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো শিল্পপ্রক্রিয়ায় গ্যাসচালিত বয়লার ব্যাপক পরিমাণে জ্বালানি ব্যবহার করে। শুধু রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে এসব বয়লার এখনই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সিপিডি। ফলে পোশাকশিল্পের ডিকার্বনাইজেশন বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৌশলে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি কম জ্বালানি ব্যবহারকারী প্রযুক্তি এবং শিল্পের তাপ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
এখানেই পোশাকশিল্পের জন্য সৌরবিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা গেলেও শিল্পের তাপের বড় অংশ এখনো গ্যাসনির্ভর। তাই শুধু ছাদে সৌর প্যানেল বসালেই জ্বালানি সংকটের পুরো সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ ও তাপ—দুই ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের জন্য আলাদা প্রযুক্তিগত রূপান্তর প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে কারখানার আকারভেদেও জ্বালানি দক্ষতার বড় পার্থক্য রয়েছে। সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে ছোট কারখানাগুলোর সম্ভাব্য জ্বালানি সাশ্রয়ের ঘাটতি ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে বড় কারখানায় তা মাত্র ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পুরোনো যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং অর্থায়ন সংকটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
একই কাজের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মধ্যেও জ্বালানি ব্যবহারে বড় ব্যবধান রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ব্যান্ড-নাইফ কাটিং মেশিন প্রতি ইউনিট উৎপাদনে লেজার কাটিং মেশিনের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে। আবার একটি বাটনহোল মেশিন সবচেয়ে দক্ষ সেলাই মেশিনের তুলনায় প্রায় ১৪০ গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে।
এই যন্ত্রপাতিগুলো আধুনিকায়ন করা গেলে ৩৫০টি কারখানায় গড়ে ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব বলে হিসাব দিয়েছে সিপিডি। কিন্তু এর জন্যও প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ। গবেষণার হিসাবে, মাত্র ৫০ শতাংশ কারখানায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করতে প্রায় ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা এবং সব কারখানায় এ পরিবর্তন আনতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
তবে শুধু যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করেও পোশাকশিল্পের কার্বন নিঃসরণ বড় মাত্রায় কমানো সম্ভব নয়। কারণ, কারখানাগুলোর মোট যন্ত্রপাতির ৮৫ দশমিক ২ শতাংশই সেলাই বিভাগের, যার বড় অংশ সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। ফলে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর সঙ্গে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোই হতে পারে তুলনামূলক কার্যকর সমন্বিত কৌশল।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতাও বাংলাদেশের সামনে দ্রুত রূপান্তরের চাপ তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের পরিবেশগত বিধিনিষেধ ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহকারী কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টিকে ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে না পারলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিজিএমইএর সহসভাপতি ও দেশ গার্মেন্টস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বিদিয়া অমৃত খান বলেন, প্রচলিত জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া এখন বৈশ্বিক প্রয়োজন। আগামী কয়েক বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন নির্দেশনা ও বিধিমালা কার্যকর হওয়ার কারণে বাংলাদেশের হাতে সময় খুব কম। তাঁর মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর ও ভ্যাট কাঠামো আরও সহায়ক করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদও নীতিগত বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, সৌরপ্রযুক্তির ওপর এখনো উচ্চ ভ্যাট রয়েছে, যা শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ না হলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকার ঝুঁকি রয়েছে। ইউরোপীয় বাজারে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তহবিলের সুযোগ থাকলেও এসব তহবিলে প্রবেশাধিকার সহজ নয়। তাই অর্থায়নের পথ সহজ করা জরুরি।
অর্থায়নই এখন সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিকল্প প্রযুক্তিতে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ছোট কারখানাগুলোর জন্য এই প্রাথমিক ব্যয় বহন করা আরও কঠিন। নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে সময় লাগা এবং ঝুঁকি নেওয়ার অনীহাও বিনিয়োগকে ধীর করছে।
এ কারণে সিপিডি বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি সহজ শর্তের ঋণ ও সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প মূল্যায়নে সহজ ও মানসম্মত পদ্ধতি চালুর পরামর্শও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতিতে প্রণোদনা, নিয়মিত জ্বালানি নিরীক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ রয়েছে।
বড় কারখানাগুলোর জন্য শুধু নিজস্ব ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ যথেষ্ট নয়—এমন মতও এসেছে শিল্প খাত থেকে। ডিবিএল গ্রুপের প্রধান সাসটেইনেবিলিটি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল্লাহর মতে, বাংলাদেশের ডিকার্বনাইজেশনের বড় হাতিয়ার হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ। কিন্তু বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য শিল্পাঞ্চলভিত্তিক বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকার জমির ব্যবস্থা করতে পারে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পোশাকশিল্প একদিকে জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে পারবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত শর্ত পূরণে এগিয়ে যেতে পারবে। তবে তার জন্য শুধু কারখানার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নীতি, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
সিপিডির গবেষণার মূল বার্তাটি তাই শুধু ‘সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলে খরচ কমবে’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে গড় জ্বালানি ব্যয় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমার সম্ভাবনা পোশাকশিল্পের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তবে রূপ দিতে হলে বড় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, সহজ অর্থায়ন, কর-ভ্যাট সংস্কার এবং শিল্পের তাপ ব্যবস্থায় বিকল্প প্রযুক্তির সমাধান একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
কারণ বৈশ্বিক পোশাক বাজারে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর করবে না। কে কতটা কম কার্বন নিঃসরণ করে, কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে—সেই সক্ষমতাও ক্রমেই রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করবে।













