উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, সমাধানে অন্তত দুই বছর

DSJ Web Photo BangladeshEconomy
ছবি- অ্যামচেম

বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও সঞ্চালন অবকাঠামোর দুর্বলতা, গ্যাসের ঘাটতি, জ্বালানি আমদানির চাপ এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট রাতারাতি কাটছে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই সংকট পুরোপুরি সামাল দিতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে তাঁর দাবি, দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি করতে সরকার কোনো সময় নষ্ট করছে না।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বিল্ডিং ইনভেস্টরস কনফিডেন্স: ফ্রম পলিসি রিফর্ম টু ইফেক্টিভ ইমপ্লিমেন্টেশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকার যে সংকট পেয়েছে, তা এক দিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। অর্থনীতি সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য হলেও বিদ্যমান ঘাটতি কাটাতে সময় প্রয়োজন।

মন্ত্রী বলেন, “সবকিছু দ্রুততম সময়ে করার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে আমরা এক মুহূর্তও নষ্ট করছি না।” তাঁর মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে শিল্প, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বার্থে জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা সমাধানকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং স্থলভিত্তিক গ্যাস সংরক্ষণ অবকাঠামোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বিস্তারিত জানা যাবে। এর মধ্য দিয়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ খাতে সংকটের ধরন কিছুটা ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, দেশে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে; কিন্তু সেই বিদ্যুৎ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সঞ্চালন ব্যবস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ালেই সংকটের সমাধান হবে না, উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে জাতীয় গ্রিডে নেওয়া এবং সেখান থেকে শিল্প ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যমান পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার যে পরিসংখ্যান পাচ্ছে, তা প্রকৃত পরিস্থিতির তুলনায় অনেক কম হতে পারে। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, চাহিদা এবং জ্বালানি ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র বিবেচনায় নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একক কোনো জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এই মিশ্রণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথা রয়েছে। দেশের নিজস্ব কয়লার মজুতকে কাজে লাগিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও সরকার পর্যালোচনা করছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকার মোটামুটি একটি সমন্বিত জ্বালানি কাঠামো নির্ধারণের পর্যায়ে পৌঁছেছে। সময়ের সঙ্গে এর বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জ্বালানি সংকটের বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন শিল্প ও বিনিয়োগের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকে ব্যবসায়ীরা অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছেন। অ্যামচেমের অনুষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, নীতিগত সংস্কার, ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা এবং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উঠে আসে।

অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে উদীয়মান ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে নীতিগত সংস্কারের ধারাবাহিক ও কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রয়োজন।

এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমানও বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য মূলধনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশের পাশাপাশি বাণিজ্য সহজ করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী ব্যবসার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো, কর প্রশাসনে অটোমেশন এবং বন্দর ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার সরকারি উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিয়ম মেনে পরিচালিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ, কর পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং করব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থার দক্ষতাও বাড়বে।

তবে এসব সংস্কারের বাস্তব ফল পেতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে বা বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ও সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়েছে বলে এর আগে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন। এতে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

এখন সরকারের পরিকল্পনার মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একদিকে দ্রুত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহ ঝুঁকি কমানো। গ্যাসের জন্য এলএনজি ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস, কয়লা—সব উৎসকে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামো তৈরি করতে চাইছে সরকার।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই শুধু তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের জন্য একটি নতুন জ্বালানি কাঠামো তৈরির ইঙ্গিতও রয়েছে। তবে সেই কাঠামো কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং অর্থনীতির গতি কতটা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top