ঋণ ও আমানত—দুই ক্ষেত্রেই শিল্পের গড়ের চেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি, পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয় বাড়ায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বড় মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে গ্রাহক আমানত বেড়েছে ২৫ শতাংশ এবং ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১৮ শতাংশ।
ব্যাংকটির অর্ধবার্ষিক আর্থিক ফলাফলে দেখা যায়, মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসার পরিধিও দ্রুত বেড়েছে। ৩০ জুন শেষে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত ৯৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিমের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তরিক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, এই ফলাফল তাঁদের ব্যবসায়িক মডেলের শক্তি, বিচক্ষণ সুশাসন এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো এবং গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল সেবা বিস্তারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সমন্বিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৪২৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ মুনাফা ছিল ৯০৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।
শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য মুনাফার প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি। প্রথম ছয় মাসে এ মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের ৭০৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ৬৪ শতাংশ বেশি। ফলে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
মুনাফা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে বিনিয়োগ আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৫৬ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৪৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ আয় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
একই সময়ে নিট সুদ আয়ও বেড়েছে। প্রথম ছয় মাসে নিট সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের ৮১৭ কোটি ১৭ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। কমিশন, বিনিময় ও ব্রোকারেজ থেকেও আয় বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ।
সব মিলিয়ে ব্যাংকের মোট পরিচালন আয় প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পরিচালন ব্যয় বাড়লেও আয়ের তুলনায় ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি কম থাকায় পরিচালন মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
ব্যাংকের দক্ষতা বৃদ্ধির চিত্রও উঠে এসেছে কস্ট-টু-ইনকাম রেশিওতে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে এ অনুপাত কমে ৪২ শতাংশে নেমেছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। ব্যাংকটির মতে, ডিজিটাল রূপান্তর ও পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে এই উন্নতি হয়েছে।
ব্যবসা সম্প্রসারণের দিক থেকেও প্রথমার্ধে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। গ্রাহক আমানত ২৫ শতাংশ এবং ঋণ বিতরণ ১৮ শতাংশ বেড়েছে—দুটিই ব্যাংকিং খাতের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। জুন শেষে আমানত ৯৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণ ও অগ্রিম প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে ব্যাংকের প্রভিশন ব্যয়ও কমেছে। প্রথম ছয় মাসে মোট প্রভিশন সংরক্ষণের পরিমাণ ছিল ২৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৪৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রভিশন ব্যয় কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। এতে কর-পূর্ব মুনাফা বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত সহায়তা এসেছে।
ঋণের মানের ক্ষেত্রেও কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। জুন শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রায় ১ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা ছিল। অর্থাৎ ছয় মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে।
এদিকে বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জুন শেষে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ প্রায় ৪৮ হাজার ২০১ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল প্রায় ৪১ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। ছয় মাসে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
ফলে ব্র্যাক ব্যাংকের প্রথমার্ধের ফলাফলে একই সঙ্গে তিনটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণ, আয় বৃদ্ধির গতি এবং পরিচালন দক্ষতার উন্নতি। আমানত ও ঋণ শিল্পের গড়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ আয় ও নিট সুদ আয় বৃদ্ধিতে মুনাফার ভিত্তিও শক্তিশালী হয়েছে।
তবে উচ্চ ঋণ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পদের মান ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে প্রভিশন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা ব্যাংকটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে কস্ট-টু-ইনকাম রেশিও আরও কমিয়ে আনা গেলে মুনাফার প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই হতে পারে।













