ব্যাংকের শাখা নয়, স্থানীয় এজেন্টের হাত ধরেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়ছে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের বিস্তার। কোথাও ঋণের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, কোথাও নতুন আমানত হিসাব খোলার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে সিলেট, আর আমানত হিসাব ও আমানত বৃদ্ধিতে সবচেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে বরিশাল। অর্থাৎ এজেন্ট ব্যাংকিং এখন শুধু প্রবাসী আয় গ্রহণ বা নগদ টাকা তোলার মাধ্যম নয়; স্থানীয় সঞ্চয়, ঋণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও এর সংযোগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এজেন্ট ব্যাংকিং পরিসংখ্যান প্রতিবেদন (এপ্রিল-জুন ২০২৬)’ বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। একই সময়ে এ ব্যবস্থার মোট হিসাবধারীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ। এর মধ্যে বরিশালে আমানত হিসাব ও আমানতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হলেও ঋণের স্থিতি ও প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে রয়েছে সিলেট।
সিলেটে জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৪৮ মিলিয়ন টাকা, যা প্রায় ৫২৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই ঋণ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ—বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। শুধু গ্রামীণ এলাকায় ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ।
প্রবাসী আয়ের জন্য পরিচিত সিলেট অঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণের এমন দ্রুত বিস্তার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসা, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও পারিবারিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকঋণের ব্যবহার বাড়ছে কি না, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঋণের পরিমাণ বাড়াকে সরাসরি অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঋণ কোন খাতে যাচ্ছে এবং এর বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি কী—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে আমানত হিসাব খোলার প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বরিশাল। জুন শেষে বিভাগটিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৭টি। এক বছরের ব্যবধানে হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে বরিশালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত বেড়েছে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
কৃষি, মৎস্য ও নদীনির্ভর অর্থনীতির বরিশালে এই প্রবৃদ্ধি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য কাছাকাছি এজেন্ট আউটলেটই অনেক সময় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের সবচেয়ে সহজ পথ। সঞ্চয় জমা, টাকা উত্তোলন, রেমিট্যান্স গ্রহণসহ বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকায় এজেন্ট ব্যাংকিং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
জাতীয় চিত্রেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার স্পষ্ট। জুন শেষে এ ব্যবস্থায় আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ১২৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মার্চ শেষে যা ছিল ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় ৫৬৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
তবে এই আমানতের বড় অংশই গ্রামাঞ্চলে। জুন শেষে গ্রামীণ এজেন্টগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। শহরের এজেন্টগুলোর আমানত ছিল প্রায় ৯ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামীণ এজেন্টগুলোতে আমানত বেশি ছিল প্রায় ৩২ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এতে স্পষ্ট হয়, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তি এখনো গ্রামীণ অর্থনীতি।
লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৮৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। মার্চ প্রান্তিকে যা ছিল ১ লাখ ৪২ হাজার ৬২৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। তিন মাসে লেনদেন বেড়েছে ৩ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে জুন প্রান্তিকে গ্রামীণ এজেন্টগুলোতে লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ কোটি ৪ লাখ টাকা। শহরের এজেন্টগুলোতে হয়েছে ২৫ হাজার ৭৫৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামীণ এজেন্টগুলোতে লেনদেন বেশি হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। এ ব্যবধানই দেখিয়ে দেয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিং এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হিসাবধারীর সংখ্যাতেও বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাব ছিল ২ কোটি ৭২ লাখ ২৩ হাজার ৮১টি। মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩টি। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে নতুন হিসাব বেড়েছে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৭৮টি।
একই সময়ে এজেন্টের সংখ্যা ১৫ হাজার ১৮৪টি থেকে বেড়ে ১৫ হাজার ৪২৩টিতে এবং আউটলেটের সংখ্যা ২০ হাজার ৩৩৯টি থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৫৯৭টিতে দাঁড়িয়েছে। তিন মাসে নতুন এজেন্ট যুক্ত হয়েছে ২৩৯টি এবং আউটলেট বেড়েছে ২৫৮টি।
তবে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৫ হাজার ৯১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। মার্চ প্রান্তিকে এ মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে প্রায় ৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ফলে আমানত ও লেনদেনের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও রেমিট্যান্সে দুর্বলতা রয়েছে।
বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে। ইউএনডিপির সহায়তায় উদ্যোগ নেওয়ার পর ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়াকে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে এবং ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য ব্যাংকও এই সেবা বিস্তৃত করে।
এক দশকের কিছু বেশি সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিসর এখন অনেক বড়। এর মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের সঞ্চয় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আসছে, ঋণের সুযোগ বাড়ছে এবং ব্যাংকিং সেবার ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কমছে। নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তবে বিস্তারের সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের আর্থিক ও ডিজিটাল সচেতনতার ঘাটতি, পিন বা গোপন তথ্য অন্যের কাছে প্রকাশ, প্রতারণামূলক ফোনকল, ভুয়া লেনদেন এবং এজেন্টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মতো ঝুঁকি রয়েছে। ফলে শুধু এজেন্ট ও আউটলেট বাড়ানো নয়, গ্রাহক সুরক্ষা, এজেন্টদের তদারকি, লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান তাই একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—এজেন্ট ব্যাংকিং আর শুধু ব্যাংকের শাখার বিকল্প নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সংযোগ হয়ে উঠছে। সিলেটে ঋণের চাহিদা, বরিশালে আমানতের প্রবৃদ্ধি এবং সারা দেশে হিসাব ও লেনদেনের বিস্তার দেখাচ্ছে, এই ব্যবস্থার ব্যবহার ক্রমেই বহুমুখী হচ্ছে। এখন এর সাফল্য নির্ভর করবে ঋণের মান, আমানতের স্থায়িত্ব, গ্রাহক সুরক্ষা এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য সেবাটি কতটা নিরাপদ ও কার্যকর রাখা যায় তার ওপর।













