বাংলাদেশের বিদেশি বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা আরও গভীর হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। বিপরীতে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। ফলে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৭৬ গুণ। সহজ হিসাবে, বাংলাদেশ প্রতি ১ টাকার পণ্য রপ্তানির বিপরীতে বিদেশ থেকে প্রায় ১ টাকা ৭৬ পয়সার পণ্য আমদানি করেছে।
এই ব্যবধান শুধু বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর চাপ তৈরি করছে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, আমদানি সক্ষমতা এবং বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও বাণিজ্য ঘাটতির ওঠানামার মধ্যে একটি বড় বৈষম্য দেখা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৮১৬ কোটি টাকায় ওঠে। এরপর আমদানি নিয়ন্ত্রণের ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঘাটতি কমে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকায় নামে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় আবার দ্রুত বাড়ায় ঘাটতি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়।
মাথাপিছু হিসাবেও বাণিজ্য ভারসাম্যের চাপ স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৫৭০ টাকা। আগের অর্থবছরে তা ছিল ৫৪ হাজার ৫২৮ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে মাথাপিছু আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৫ হাজার ৪২ টাকা বা প্রায় ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে মাথাপিছু রপ্তানি আয় কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাথাপিছু রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৬ হাজার ৮৬১ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৬৬ টাকা। অর্থাৎ মাথাপিছু রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ২ হাজার ৯৯৫ টাকা বা ৮ দশমিক ১২ শতাংশ।
রপ্তানি ও আমদানির এই বিপরীতমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দেশের উৎপাদনব্যবস্থা এখনো শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্যের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর। ফলে আমদানি দ্রুত বাড়লেও রপ্তানি আয় একই গতিতে বাড়ছে না।
জিডিপির তুলনাতেও রপ্তানি খাতের সংকোচনের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় পণ্য রপ্তানির অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই অনুপাত ছিল ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বাড়লেও জিডিপির তুলনায় পণ্য রপ্তানির অবদান সেই অনুপাতে বাড়েনি।
অন্যদিকে জিডিপির তুলনায় আমদানির অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ফলে দেশের উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থায় বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতার মাত্রা এখনো অনেক বেশি। গত পাঁচ বছরের হিসাবে আমদানির গড় প্রবৃদ্ধিও তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
রপ্তানি খাতের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় কারণ তৈরি পোশাক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় এই আয় কমেছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে আয় কমেছে প্রায় ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ। ফলে সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে।
তবে রপ্তানির সব খাতেই একই ধরনের পতন হয়নি। বরং কয়েকটি অপ্রচলিত ও সম্ভাবনাময় পণ্যে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পাদুকা রপ্তানি বেড়েছে ২০ দশমিক ৫৫ শতাংশ; আয় হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, আয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। টুপি ও হেডগিয়ার রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ, আয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকার বেশি।
অন্যদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। এ খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। চা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
আমদানি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আমদানি ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ রপ্তানি কমার বিপরীতে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই দুই প্রবণতার কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বেড়েছে।
আমদানিতে বেসরকারি খাতের আধিপত্য স্পষ্ট। বেসরকারি খাতের আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। সরকারি খাতের আমদানি ছিল প্রায় ৩২ হাজার ২০৫ কোটি টাকা এবং সেমি-গভর্নমেন্ট পর্যায়ে আমদানি হয়েছে প্রায় ৭৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।
আমদানির ধরনেও বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। মধ্যবর্তী পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ১৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা, যা মোট আমদানির প্রায় ৭৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা।
তবে উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল প্রায় ৭৬ হাজার ২৬১ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। নতুন শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই পতন বেসরকারি বিনিয়োগের গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
জ্বালানি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। ভোজ্যতেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
লোহা ও ইস্পাত আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা। যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। খাদ্যশস্যের মধ্যে চাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা এবং গম আমদানিতে প্রায় ২২ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।
দেশের আমদানি বাজারে চীনের আধিপত্যও আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আমদানির ২৮ দশমিক ২০ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। দেশটি থেকে আমদানির অর্থমূল্য ছিল প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪০৫ কোটি টাকার পণ্য।
রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রপ্তানির ১৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। এরপর রয়েছে জার্মানি, যেখানে রপ্তানির অংশ ১০ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্য, যার অংশ ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যেও ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। ভুটানের সঙ্গেও ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। তবে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রায় ৩১৬ কোটি টাকার বাণিজ্য উদ্বৃত্তে রয়েছে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও আমদানির চাপের ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আমদানি ছিল সর্বোচ্চ, প্রায় ৯৬ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল—প্রায় ৩৭ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।
সামগ্রিক চিত্র বলছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আমদানি কমানো নয়; বরং রপ্তানির ভিত্তি সম্প্রসারণ, অপ্রচলিত পণ্যের বাজার বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভর শিল্প কাঠামোর মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পাদুকা, প্লাস্টিক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো না গেলে বাণিজ্য ঘাটতির কাঠামোগত চাপ কমানো কঠিন হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—বাংলাদেশ যতটা পণ্য বিদেশে বিক্রি করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পণ্য বিদেশ থেকে কিনছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বহিঃখাতের ভারসাম্য ধরে রাখতে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সক্ষমতা এখন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নীতি-চ্যালেঞ্জ।













