এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে জোয়ার, তিন মাসে ৭ লাখের বেশি নতুন হিসাব

DSJ Web Photo agent
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

শাখার দরজা নয়, এখন গ্রামের হাট-বাজার, ছোট দোকান কিংবা স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই হয়ে উঠছে অনেক মানুষের ব্যাংকিংয়ের ঠিকানা। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সেবার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিংয়েও ধারাবাহিক সম্প্রসারণ ঘটছে। শুধু এপ্রিল-জুন—এই তিন মাসেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নতুন হিসাব খুলেছে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৭৮টি। একই সময়ে আমানত বেড়েছে ৫৬৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং লেনদেন বেড়েছে ৩ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

শুধু গ্রাহক ও লেনদেন নয়, এই সময়ে এজেন্ট ও আউটলেটের সংখ্যাও বেড়েছে। তিন মাসে নতুন এজেন্ট যুক্ত হয়েছে ২৩৯টি এবং আউটলেট বেড়েছে ২৫৮টি। ফলে ব্যাংকের প্রচলিত শাখার বাইরে বিকল্প এই ব্যাংকিং চ্যানেলটি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ এজেন্ট ব্যাংকিংসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ১২৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মার্চ শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে আমানত বেড়েছে ৫৬৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ১ দশমিক ১২ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানতের বড় অংশই রয়েছে গ্রামাঞ্চলে। জুন শেষে গ্রামের এজেন্টগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। শহরের এজেন্টগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত আমানত ছিল ৯ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট আমানতের প্রায় ৮২ শতাংশই এসেছে গ্রামীণ এজেন্টগুলো থেকে। শহরের তুলনায় গ্রামে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত বেশি ৩২ হাজার ৯৭৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

লেনদেনের ক্ষেত্রেও গ্রাম এগিয়ে। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৮৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। মার্চ শেষে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪২ হাজার ৬২৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ফলে তিন মাসে লেনদেন বেড়েছে ৩ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা প্রায় ২ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

জুন প্রান্তিকে গ্রামের এজেন্টগুলোর মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ কোটি ৪ লাখ টাকা। শহরের এজেন্টগুলোর মাধ্যমে হয়েছে ২৫ হাজার ৭৫৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট লেনদেনের প্রায় ৮২ শতাংশই হয়েছে গ্রামীণ এজেন্টগুলোর মাধ্যমে। শহরের তুলনায় গ্রামে লেনদেনের পরিমাণ বেশি ৯৪ হাজার ৬৭১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধিও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তার একটি বড় ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৩ হাজার ৮১টিতে। মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩টি। অর্থাৎ তিন মাসে নতুন হিসাব যুক্ত হয়েছে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৭৮টি। তিন মাসে হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

এই সম্প্রসারণের সঙ্গে বেড়েছে সেবাদানকারী এজেন্ট ও আউটলেটের সংখ্যাও। মার্চ শেষে এজেন্টের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ১৮৪টি। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪২৩টিতে। অর্থাৎ তিন মাসে ২৩৯টি নতুন এজেন্ট যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে আউটলেটের সংখ্যা ২০ হাজার ৩৩৯টি থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৫৯৭টিতে দাঁড়িয়েছে। বেড়েছে ২৫৮টি আউটলেট।

তবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রবাসী আয় আসার ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৫ হাজার ৯১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এসেছিল ৮ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক প্রান্তিকের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় কমেছে ৩ হাজার ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বা প্রায় ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সামগ্রিক চিত্রে অবশ্য আমানত, লেনদেন, হিসাব, এজেন্ট ও আউটলেট—প্রায় সব সূচকেই প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ব্যাংকিং সেবার বিস্তারে এই ব্যবস্থার ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় আনা, ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহজে টাকা জমা ও উত্তোলনের ব্যবস্থা তৈরিতে এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে। ইউএনডিপির সহায়তায় এ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন পায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। পরে ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নীতিমালা জারি করে। এর কিছুদিন পর ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া।

এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকও এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। বর্তমানে শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এই ব্যবস্থার মূল শক্তি এখনো গ্রামকেন্দ্রিক। ফলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার শুধু ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণ নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে সঞ্চয়, লেনদেন ও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার অংশগ্রহণ বাড়ানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top